21/09/2025
আলোর দীপ # দ্বিতীয় পর্ব # ১৪
---------------------------------------------
মোছাঃ জয়তুন নেছা : নার্সিং জগতে যেন
রংপুরের এক নতুন 'ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল'
-------------------------------------------- রানা মাসুদ
তিনি রংপুর অঞ্চলে নার্সিং পেশায় এক প্রবীণ ব্যক্তিত্ব । নতুন নতুন নার্স তৈরি তথা নার্সিং শিক্ষার আলো প্রজন্মের পর প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেবার মশালটা হাতে নিয়ে আজীবন ছুটে চলা এক আলোর দীপ। সারাটা জীবন তিনি মানবসেবার কারিগর তৈরির পেছনে ব্যয় করে চলছেন। তিনি প্রবীণ নার্সিং শিক্ষক মোছাঃ জয়তুন নেছা।
১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ ফেব্রুয়ারি দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার তাজনগর বাবইপাড়া গ্রামে জন্ম তাঁর। পিতা আব্দুস সোবহান এবং মা নূরুন নেছা। দুজনেই ইন্তেকাল করেছেন সেও অনেকদিন হলো। তিনি তাঁর মায়ের একমাত্র সন্তান।
স্থানীয় দাগলাগঞ্জ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশুনার শুরু। এরপর চিরিরবন্দর বিন্যাকুড়ি হাইস্কুল থেকে এসএসসি পাস করলেন। এসময় পারিবারিক কিছু সমস্যার কারণে তাঁকে তাঁর এক মামার বাড়িতে থাকতে হয়েছিল। মামার সংসারে আশ্রয়ী হয়ে থাকার কারণে হোমিও কলেজে ভর্তি হবার পরেও আর সেখানে পড়াশুনা না করে নার্সিং-এ পড়তে এবং সেবিকার পেশা বেছে নিতে মনস্থির করলেন। তিনি রংপুর নার্সিং ইনস্টিটিউটের দ্বিতীয় ব্যাচে ভর্তি হলেন।
যদিও তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থায় নার্সিং পেশার প্রতি আগ্রহহীনতা দেখা গেলেও জয়তুন নেছা সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি এই পেশায় আত্মনিয়োগ করবেন। ব্যাপারটা প্রথম দিকে এমনটা ছিল না যে মানবসেবায় তিনি ছোটকাল থেকে ব্রতি হয়েই এই পেশার শিক্ষা গ্রহণ শুরু করলেন। নার্সিং পড়াশুনার শুরুর পর থেকেই তিনি যেন ভিন্ন এক আলোর জগত দেখতে পারলেন। উপলব্ধি করতে লাগলেন এই শিক্ষা তথা পেশার মাধ্যমে মানবসেবার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করা সম্ভব। শিক্ষার শুরুতেই আধুনিক নার্সিংয়ের প্রতিষ্ঠাতা ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলের জীবনী অন্যান্য শিক্ষার্থীদের মতোই তাঁকেও বিশেষভাবে আকৃষ্ট করলো। সত্তরের দশকের সেসময় যদিও তখন আমাদের কোনো যুদ্ধ ছিল না তবুও মনে করেন মানবসেবার জন্য যুদ্ধ তো চিরকালই। নাইটিঙ্গেল যদিও ক্রিমিয়ান যুদ্ধে সৈন্যদের সেবার মাধ্যমে যে সংগ্রাম তথা নার্সিংয়ের দৃষ্টান্ত তৈরি করেছিলেন এবং যুদ্ধ পরবর্তী লন্ডনে ফিরে আধুনিক নার্সিংয়ের প্রবর্তন শুরু করেন। তিনি যে নাইটিঙ্গেল নার্সিং স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন যা ছিল নার্সিং শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রথম পদ্ধতিগত প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ এই পেশা বিস্তারের জন্য মানষকে উদ্বুদ্ধ করার চেয়েও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলো এর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার।
রংপুর নার্সিং ইন্সটিটিউটে চার বছরের শিক্ষা জীবন শেষ করে তিনি সরকারি চাকরিতে যোগদান করলেন। তাঁর প্রথম পোস্টিং হলো ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে গঙ্গাচড়া হেলথ কমপ্লেক্স সিনিয়র স্টাফ নার্স হিসেবে। কিন্তু তিনি মিঠাপুকুর থানা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পদায়ন নিয়ে সেখানে ১৯৭৯ পর্যন্ত কাজ করেন। এরপর বিএসসি নার্সিং কোর্স করতে ঢাকার মহাখালিস্থ ইন্সটিটিউটে ভর্তি হলেন। এখান থেকে ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে বিএসসি নার্সিং কোর্স সম্পন্ন করলেন। পুনরায় গঙ্গাচড়ায় পূর্ব কর্মস্থলে যোগদান করলেন। এর একমাস পর কুড়িগ্রাম নার্সিং ইন্সটিটিউটে ইন্সট্রাকটর পদে যোগদান করলেন। তিন বছর পর কুড়িগ্রাম জেলা পাবলিক হেলথ নার্স হিসেবে যোগদান করলেন। এই পদ জেলা সদরে তখন একটাই ছিল। এরপর লালমনিরহাটে একই পদে বদলি হলেন। পরে তিন মাস পীরগঞ্জে পদায়নের পর পুনরায় কুড়িগ্রাম নার্সিং ইন্সটিটিউটে বদলি হলেন। এখানে নার্সিং ইন্সট্রাকটর হিসেবে ১৯৯২ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত থাকলেন। এখানে উল্লেখ্য যে এই 'নার্সিং ইন্সট্রাকটর ' পদটি মূলত কলেজের অধ্যাপকের মতোই নার্সিং শিক্ষক পদ। নার্সিং ইন্সটিটিউটে এই পদের ভিন্ন ধারাবাহিকতা নেই। এরপর রংপুর নার্সিং ইন্সটিটিউটে ইন্সট্রাকটর হিসেবে যোগদান করলেন এবং ২০১২ খ্রিস্টাব্দে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে অবসরে গেলেন। অবসর মূলত সরকারি চাকরি থেকে হলেও তাঁর সঞ্চিত অভিজ্ঞতার আলোকে দায়িত্ব ও কর্তব্য থেকে যেন কোনো অবসর নেই। অবসর জীবনের কোনো অবসর পেলেন না কিংবা নিলেন না তিনি। যোগদান করলেন একটি বেসরকারি নার্সিং ইনস্টিটিউটে সিনিয়র নার্সিং ইন্সট্রাকটর হিসেবে। কিছুদিন এখানে দায়িত্ব পালন করার পর আরেকটি বেসরকারি নার্সিং ইনস্টিটিউটে প্রিন্সিপাল হিসেবে যোগদান করলেন। এরপর তিনি রংপুরের অপর একটি নার্সিং ইনস্টিটিউটে বেশ কিছুদিন প্রিন্সিপালের দায়িত্ব পালন করে বর্তমানে ২০২১ খ্রিস্টাব্দ থেকে অপর একটি নার্সিং ইনস্টিটিউটে প্রিন্সিপালের দায়িত্ব পালন করছেন। প্রিন্সিপাল হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব পালন ছাড়াও তিনি নিয়মিত ক্লাস নেন। নার্সিংয়ের নবীন শিক্ষার্থীদের শেখাতে ভীষণ ভালোবাসেন। তিনি মনে করেন, সারাজীবন এই পেশার শিক্ষকতা করে যে জ্ঞান অর্জন করেছেন তা বিলিয়ে দেবার জন্য। অধ্যক্ষের চেয়ারে বসে প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব শুধু পালন করার জন্য নয়। তিনি শেখাতে ভালোবাসেন, শেখাতে জানেনও কেননা এই পেশার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তো আছেই, এর বাইরেও তাঁর ঝুলিতে আছে আরও কিছু অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা। তিনি সার্কভুক্ত সাত দেশের ১৪ জন কৃতি নার্সের একটি বিশেষ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছিলেন ভারতে। জাপানে একটি উচ্চ প্রশিক্ষণের সুযোগ পেয়েও ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে নিতে পারেননি। প্রশিকা থেকে বিশেষ স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রশিক্ষণ নেন, সিভিল সার্জন অফিস এবং এরকম আরও অনেকগুলো প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার তাঁর ঝুলিতে। এইসব কারণে তিনি মনে করেন এই মানবিক পেশায় নতুন নতুন পেশাজীবী তৈরি করতে হবে। এজন্য দরকার প্রশিক্ষণ। যোগ্য তথা যথাযথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নতুন নতুন যোগ্য নার্স তৈরি করা অন্যতম পথ। একেকজন নার্স যথাযথ শিক্ষার মাধ্যমে বিকশিত হলে একদিকে যেমন এই বিশাল জনগোষ্ঠীর চাহিদা অনুযায়ী মানবসেবার পথে নতুন নতুন মানুষের আগমন ঘটবে। অপরদিকে এই পেশায় দেশ ও বিদেশে ব্যাপক চাহিদা থাকার ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
এই দীর্ঘ নার্সিং পেশা জীবনের পুরোটা সময় তাঁর কেটেছে প্রশিক্ষক তথা শিক্ষকের ভূমিকাতেই। অসংখ্য স্মৃতির ভিড়ে ভালোলাগা, ভালোবাসা আর কষ্ট জুড়ে আছে। বয়সের ভারে এখন অসংখ্য ঘটনার কথা মনে নেই। তবুও তাঁর ভালোলাগা জুড়ে আছে শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা আর সফলতার গল্প। অসংখ্য অসংখ্য শিক্ষার্থী তাঁর শিক্ষা পেয়ে, উৎসাহ পেয়ে, দিক নির্দেশনা পেয়ে আজ নার্সিং পেশায় সফল থেকে সফলতার শীর্ষে আহরণ করেছে। তাঁর অসম্ভব ভালোলাগা যখন কোর্স শেষ করে একেকজন শিক্ষার্থী ক্যাম্পাস থেকে বের হয় কর্মজীবন শুরুর জন্য। তাঁর বুক ভরে ওঠে তখন-এইতো মানুষের জন্য, মানবতার জন্য, আদর্শের জন্য কিছু আলো নিয়ে নবীন মানবিক মানুষ সমাজের ভিন্ন কিছু হয়ে আলোর দীপ জ্বাললো। তিনি নতুন প্রজন্মের সেবক-সেবিকাদের একজন সেবক হিসেবে মানুষের পাশে সর্বদা দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।
কর্মজীবনের পুরোটাই যেন সুনামে ভরা তাঁর। ভালো কথাবার্তা, ভালো ব্যবহারের জন্য তিনি সবসময় তাঁর অগ্রজ কিংবা অনুজদের শ্রদ্ধা ভালোবাসার মানুষ। নার্সিং ইন্সট্রাকটর হিসেবে কর্মরত সময়ে তিনি সরকার থেকে গোল্ড মেডেল পুরস্কার হিসেবে লাভ করেন।
মোছাঃ জয়তুন নেছা একজন পরোপকারী মানুষ। নীরবে তিনি মানুষের সেবা এবং নানাবিধ সহযোগিতা করে থাকেন। তাঁর কাছে শিক্ষার্থীরা নানাবিধ শিক্ষার সহযোগিতা তো পায়। এছাড়াও তিনি দরিদ্র অসহায় শিক্ষার্থীর জন্য অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন রকমের সেবা, সহযোগিতা করে থাকেন। তিনি একলা মানুষ। ব্যক্তিগত জীবনে আর সংসার করে ওঠা হয়নি। তাঁর উপার্জিত সম্পদ দিয়ে মানবসেবার জন্য তিনি নিজ মায়ের নামে 'নূরুন নেছা কল্যাণ ট্রাস্ট' গঠন করতে চান। #
তথ্যসূত্র: collected