12/09/2026
বাংলাদেশের চামড়া শিল্প দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানিমুখী খাত। স্বাধীনতার পর রাজধানীর হাজারীবাগে গড়ে ওঠা ট্যানারি শিল্প একদিকে যেমন অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে, অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে পরিবেশ দূষণের বড় উৎসে পরিণত হয়েছে। বছরের পর বছর ট্যানারিগুলো থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি বুড়িগঙ্গা নদীতে ফেলা হয়েছে। এসব বর্জ্যে ছিল হেক্সাভ্যালেন্ট ক্রোমিয়াম (Cr(VI)), সালফাইড, অ্যামোনিয়া, বিভিন্ন জৈব বর্জ্য এবং অন্যান্য ভারী ধাতু। ফলে নদীর পানি, তলদেশের পলি ও আশপাশের মাটি মারাত্মকভাবে দূষিত হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) করা রিটের পর উচ্চ আদালত এবং পরে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ২০১৭ সালে ট্যানারিগুলো সাভারে স্থানান্তর করা হয়। পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষার উদ্দেশ্যে নেওয়া এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও প্রশ্ন থেকেই যায়—কেবল স্থান পরিবর্তনেই কি দূষণের সমাধান সম্ভব?
গবেষণা বলছে, উত্তরটি 'না'। দূষণের স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজন কার্যকর বর্জ্য শোধন প্রযুক্তি। আর সেই প্রযুক্তির অন্যতম সম্ভাবনাময় মাধ্যম হতে পারে অণুজীব বা মাইক্রোঅর্গানিজম।
চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত রাসায়নিকগুলোর একটি হলো ক্রোমিয়াম। তবে ক্রোমিয়ামের সব রূপ সমান ক্ষতিকর নয়। হেক্সাভ্যালেন্ট ক্রোমিয়াম (Cr(VI)) অত্যন্ত বিষাক্ত। এটি পানিতে সহজে দ্রবণীয় হওয়ায় জীবকোষে দ্রুত প্রবেশ করে এবং Reactive Oxygen Species (ROS) তৈরি করে। এর ফলে ডিএনএ, প্রোটিন ও কোষঝিল্লি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীর্ঘমেয়াদে এই দূষকের সংস্পর্শে থাকলে কিডনি, লিভার ও ফুসফুসের ক্ষতির পাশাপাশি ক্যানসারের ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
অন্যদিকে ট্রাইভ্যালেন্ট ক্রোমিয়াম (Cr(III)) তুলনামূলকভাবে অনেক কম বিষাক্ত এবং সহজে অবক্ষেপ আকারে পৃথক করা যায়। তাই বিজ্ঞানীদের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে বিষাক্ত Cr(VI)-কে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ Cr(III)-এ রূপান্তর করা।
প্রকৃতির মধ্যেই রয়েছে এই সমস্যার একটি কার্যকর সমাধান। দূষিত পরিবেশে দীর্ঘদিন বসবাস করতে করতে কিছু ব্যাকটেরিয়া ভারী ধাতুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করেছে। এসব Chromium-resistant bacteria-এর দেহে থাকা Chromate Reductase এনজাইম Cr(VI)-কে Cr(III)-এ রূপান্তর করতে সক্ষম। এই প্রক্রিয়াকেই বলা হয় Microbial Bioremediation।
এই প্রযুক্তিতে ব্যাকটেরিয়া তাদের স্বাভাবিক বিপাকীয় কার্যক্রমের মাধ্যমে বিষাক্ত ক্রোমিয়াম গ্রহণ করে এবং এনজাইমের সাহায্যে সেটিকে কম বিষাক্ত রূপে পরিণত করে। আবার কিছু ব্যাকটেরিয়া Biosorption-এর মাধ্যমে কোষপৃষ্ঠে ভারী ধাতু আটকে রাখে, আর কিছু Bioaccumulation-এর মাধ্যমে কোষের ভেতরে সঞ্চয় করে। অর্থাৎ প্রকৃতিই যেন নিজের ক্ষত নিজেই সারিয়ে তোলার চেষ্টা করে।
বর্তমানে শুধু গবেষণাগারেই নয়, শিল্প পর্যায়েও এ প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। Fixed-bed Bioreactor-এ Immobilized bacterial cells ব্যবহার করে ধারাবাহিকভাবে Chromium reduction করা সম্ভব। এরপর Settling Tank-এ Cr(III)-কে Chromium Hydroxide [Cr(OH)₃] হিসেবে পৃথক করা হয়। পুনরুদ্ধার করা এই ক্রোমিয়াম আবার শিল্পে ব্যবহার করা যায়, যা Resource Recovery-এর একটি কার্যকর উদাহরণ। সবশেষে Rotating Biological Contactor (RBC) এবং Activated Carbon Filter-এর মাধ্যমে বর্জ্যজল আরও পরিশোধন করা হয়।
সাম্প্রতিক বাংলাদেশি গবেষণায় ট্যানারি বর্জ্য থেকে Bacillus spp. এবং Micrococcus spp.-এর মতো Chromium-resistant bacteria শনাক্ত করা হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এসব ব্যাকটেরিয়া কার্যকরভাবে Cr(VI)-কে কম বিষাক্ত Cr(III)-এ রূপান্তর করতে পারে। এই গবেষণা প্রমাণ করে, বাংলাদেশের নিজস্ব পরিবেশে বিদ্যমান অণুজীবই ভবিষ্যতের পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্বজুড়ে Environmental Microbiology, Industrial Microbiology এবং Biotechnology-এর সমন্বয়ে ভারী ধাতু দূষণ নিয়ন্ত্রণে নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হচ্ছে। বাংলাদেশেও বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং শিল্পকারখানার সমন্বিত উদ্যোগে দেশীয় অণুজীবভিত্তিক Bioremediation প্রযুক্তির উন্নয়ন ও শিল্প পর্যায়ে বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।
গবেষণাগারের সফলতা যদি বাস্তব শিল্পক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যায়, তবে শুধু নদী নয়, মাটি, ভূগর্ভস্থ পানি এবং জনস্বাস্থ্যও উপকৃত হবে। পরিবেশ দূষণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাই ক্ষুদ্র জীবাণুই হয়ে উঠতে পারে বড় সমাধান।
নাজমুন নাহার নিপা
সহ-সভাপতি, Jahangirnagar University Science Club