16/12/2025
১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১: বিকেল ৪টা ৩১ মিনিট: বাংলাদেশের বিজয় ও পাকিস্তানের আত্মসমর্পণ
১৯৭১-এর ডিসেম্বরে ঢাকার চারদিকে মিত্রবাহিনীর অগ্রযাত্রা দেখে ১৫ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমীর আব্দুল্লাহ খান নিয়াজী বুঝে যান তাদের পতন আসন্ন। ইয়াহিয়ার অনুমতি নিয়ে তিনি জাতিসংঘকে অনুরোধ জানান আত্মসমর্পণের ব্যবস্থা করতে। পাশাপাশি ভারতের প্রধান সেনাপতি মানেকশকেও বিষয়টি জানান।
১৬ ডিসেম্বর দুপুরে কলকাতা থেকে ঢাকায় আসেন ভারতীয় মিত্রবাহিনীর কমান্ডার জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল জেএফআর জ্যাকব। এরপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের হেডকোয়ার্টারে চলে আত্মসমর্পণের দলিল তৈরির বৈঠক।
সেখানে উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তানি বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমীর আবদুল্লাহ নিয়াজী, মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী ও মেজর জেনারেল মোহাম্মদ জামশেদ। যৌথবাহিনীর পক্ষে ছিলেন মেজর জেনারেল জেএফআর জ্যাকব, মেজর জেনারেল গন্ধর্ভ সিং নাগরা ও কাদেরিয়া বাহিনীর কমান্ডার কাদের সিদ্দিকী।
বিকেল ৪টা ৩১ মিনিটে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণের দলিলে সই করেন নিয়াজী। দলিলে পাকিস্তানি নৌ-পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের কমান্ডার রিয়ার-অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ শরিফ, পাকিস্তান বিমানবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় বিমান বাহিনীর কমান্ডার এয়ার ভাইস-মার্শাল প্যাট্রিক ডেসমন্ড কালাঘানও স্বাক্ষর করেন।
আত্মসমর্পণের আনুষ্ঠানিকতায় বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন মুক্তিবাহিনীর ডেপুটি চিফ অব স্টাফ গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকার। ভারতের পক্ষে সাক্ষী ছিলেন ভারতীয় ৪র্থ কোরের কমান্ডার লে. জেনারেল সগত সিং, পূর্বাঞ্চলীয় বিমান বাহিনীর কমান্ডার এয়ার মার্শাল হরি চাঁদ দেওয়ান ও ভারতীয় পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জে এফ আর জ্যাকব। (তথ্যসূত্র: সারেন্ডার অ্যাট ঢাকা-লে. জেনারেল জে এফ আর জেকব, নিয়াজির আত্মসমর্পণের দলিল-সিদ্দিক সালিক)
আত্মসমর্পণের বিষয় এলেই অনেকেই প্রশ্ন তোলেন মুক্তিবাহিনীর পরিবর্তে কেন মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল পাকিস্তানি বাহিনী?
এ ক্ষেত্রে মুজিবনগর সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন জনসংযোগ কর্মকর্তা নজরুল ইসলামের ‘একাত্তরের রণাঙ্গন অকথিত কিছু কথা’ নামক গ্রন্থে বলা হয়েছে, ‘‘যুদ্ধ-বিগ্রহ, জয়-পরাজয়, আত্মসমর্পণ সম্পর্কে জেনেভা কনভেনশনের আন্তর্জাতিক নীতিমালা রয়েছে। জেনেভা কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশগুলো এ নীতিমালা মানতে বাধ্য। ওই সময় বাংলাদেশ জেনেভা কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশ ছিল না। ফলে কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী মুক্তিবাহিনীর নিকট আত্মসমর্পণ করতে পারে না।
তাছাড়া শেষের দিকে সশস্ত্র যুদ্ধটি ভারত-বাংলাদেশের যৌথ কমান্ডের অধীনে হলেও যুদ্ধের অপারেটিং পার্টের পুরো কমান্ডে ছিলেন ভারতীয় সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল শ্যাম মানেকশ। এ কারণেই আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে জেনারেল মানেকশকে রিপ্রেজেন্ট করেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল অরোরা। সেখানে সাক্ষী হিসেবে বাংলাদেশি বাহিনীর পক্ষ থেকে এ কে খন্দকারও ছিলেন। অর্থাৎ পাকিস্তান ভারতীয় সেনাবাহিনীর নিকট নয় বরং আত্মসমর্পণ করেছিল যৌথ বাহিনীর কাছে। ফলে এটি ভারতীয় সেনাবাহিনীর নিকট আত্মসমর্পণ— সেটি বলারও সুযোগ নেই।”
১৯৭১ সালে তারা যে সীমাহীন গণহত্যা চালিয়েছে, তার জন্য বিন্দুমাত্র দুঃখ প্রকাশ বা ক্ষমা চায়নি পাকিস্তানের কোনো সরকার, বিচার করেনি তৎকালীন একজন জেনারেলেরও। বরং যখনই পেরেছে তখনই তারা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।
একাত্তরে ৩০ লাখ শহীদের আত্মদান, আড়াই লাখ মা-বোনের নির্যাতন এবং জাতির অসাধারণ ত্যাগের বিনিময়ে বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে। তখন বীর মুক্তিযোদ্ধারা সবাই ছিলেন আইডোলজিক্যাল যোদ্ধা। প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধার বুকে তখন একটাই আগুন ছিল— মাতৃভূমিকে মুক্ত করা। ওই চেতনা এখন অনেকটাই অনুপস্থিত বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
আজকের সবকিছুই আগামীর ইতিহাসের অংশ হবে তা নয়, কিন্তু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অনাদিকাল পর্যন্ত প্রজন্মকে আলোড়িত করবে, সামনে এগিয়ে চলার সাহস জোগাবে।
#মহান_বিজয়_দিবস #মুক্তিযুদ্ধ
#মুক্তিযোদ্ধা