16/05/2026
জীবন এতটাই ক্ষুদ্র যে ন্যানো, পিকো, ফেমটো কিংবা অটো স্কেল দিয়েও একে পুরোপুরি মাপা যায় না।”
এটি একটি সম্ভাবনাময়, মার্জিত, বিনয়ী, প্রোডাক্টিভ ও সদা হাসোজ্জ্বল একটি ছেলের ছোট্ট জীবনের গল্প—আমাদের দুই ব্যাচ জুনিয়র পিএমই (২০২৩–২৪) সেশনের শান্ত বণিকের গল্প।
মা–বাবা ও পরিবারের স্বপ্নকে বুকে নিয়ে সে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার দূরের ঠাকুরগাঁও থেকে দেশের এক প্রান্ত ছেড়ে আরেক প্রান্তে আসে, সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএমই ডিপার্টমেন্টে পড়াশোনার উদ্দেশ্যে।
তার সাথে দেখা হলেই মুখে থাকতো এক অদ্ভুত নির্মল হাসি, সালাম দিয়ে বলতো— “ভাই, কেমন আছেন?” আরো বলতো, “ভাই, আমিও একটা বাইক কিনবো… আমার জন্য একটা বাইক দেইখেন।”
শেষ পর্যন্ত সে বাইকও কিনেছিল। আজ তার বাইক আছে, কিন্তু বণিক নেই।
১৫.০৫.২৬, শুক্রবার
ঈদের আগে পরীক্ষা শেষ হওয়ায় আমরা বন্ধুরা মিলে একটি হাইকিং প্ল্যান করি, যা শেষ মুহূর্তে ক্যান্সেল হয়ে যায়। কিন্তু সকাল ১০:৩০টার দিকে অপূর্ব ভাই (ক্যাম্পাসের সবচেয়ে কাছের বড় ভাইদের একজন) ফোন দিয়ে বলেন— “রানা, রেডি হয়ে আয়, হাইকিং করবো বিছানাকান্দি টু উৎমাছড়া (১৫–১৭ কিমি)।”
আমি বলি, “আচ্ছা ভাই, ২০ মিনিটে আসতাছি।”
সবকিছু গুছিয়ে বের হই। মনে মনে ভাবি—আজ একটা ব্লগ হবে, সেই অনুযায়ী শুরু থেকেই ভিডিও ক্লিপ নেওয়া শুরু করি। সিনিয়র আর আমরা মিলে মোট ১১ জন রওনা দিই।
১১:৩০ টায় দুইটি সিএনজি নিয়ে যাত্রা শুরু করি। মাঝপথে একটি মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করি। প্রায় ২টার দিকে হাদার বাজারে নেমে পড়ি, তারপর হাইকিং করে ২:৩০–৩:০০টার মধ্যে বিছানাকান্দি পৌঁছাই।
পথে অনেক গল্প, হাসি-ঠাট্টা, ফটোশুট আর ভিডিও ক্লিপিং চলতে থাকে। আবহাওয়া ছিল অপূর্ব, ভিউ ছিল আরও মনোমুগ্ধকর।
এরপর ৩:৩০টার দিকে শুরু হয় মূল হাইকিং—বিছানাকান্দি টু উৎমাছড়া রুটে।
পথে স্থানীয়রা প্রায় সবাই অবাক হয়ে বলছিল— “ভাই, ৯৯% মানুষ তো উৎমাছড়া টু বিছানাকান্দি যায়, আপনারা উল্টো যাচ্ছেন কেন?”
আমরা হাসি দিয়ে বললাম— “হ্যাঁ, আমরা উল্টাই যাচ্ছি। আসলে ভিড় এড়ানোর জন্যই এই রুট।”
সত্যি বলতে, সকালে বিছানাকান্দি ও বিকেলে উৎমাছড়ায় পর্যটক তুলনামূলকভাবে কম থাকে—এই কারণেই সিদ্ধান্তটা ছিল।
পথে হঠাৎ দেখি আমাদের ২৩–২৪ ব্যাচের জুনিয়ররা (ওরাও ১১ জন) উৎমাছড়া থেকে বিছানাকান্দির দিকে আসছে। আমাদের দেখে তারা ভীষণ খুশি হয়, আর তাদের মধ্যে শান্ত বণিকও ছিল।
ছেলেটা হাসিমুখে সালাম দিল, হাত মেলাল। আমি বললাম— “দেরি হয়ে গেছে তোরা, আগে চলে যা।”
ওরা চলে গেল বিছানাকান্দির দিকে, আর আমরা প্রায় উৎমাছড়ার কাছাকাছি পৌঁছে যাই।
এর মাঝেই হঠাৎ একজন ফোন করে জানায়— “ভাই, বৈণিককে পাওয়া যাচ্ছে না।”
প্রথমে আমরা ভাবলাম আশেপাশেই কোথাও আছে। কিন্তু ১০ মিনিট পর আবার ফোন এলো— “ভাই, সে পানিতে নেমেছিল, এখন পাওয়া যাচ্ছে না।”
এই কথা শোনার পরই আমাদের মাথা ঠান্ডা হয়ে যায়। আমরা দ্রুত মোটরসাইকেলে বিছানাকান্দির দিকে রওনা দিই।
জানা যায়, মোট ১১ জনই পানিতে নেমেছিল। পানির গভীরতা তেমন ছিল না, স্রোতও খুব বেশি ছিল না। কিন্তু বাস্তবতা হলো—সেখানে পাথর উত্তোলনের কারণে বিভিন্ন জায়গায় হঠাৎ গভীর গর্ত তৈরি হয়েছে, আর পাহাড়ি ঢলের কারণে সেখানে পলি জমে চোরাবালির মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
গোসল করার সময় তিনজন বুক পানিতে চলে যায়—তার মধ্যে শান্ত বণিকও ছিল। মুহূর্তেই পাহাড়ি স্রোত ও চোরাবালির কারণে তারা তিনজনই বিপদে পড়ে যায়।
চিৎকার শুরু হলে স্থানীয়রা নৌকা নিয়ে দ্রুত এগিয়ে আসে। দুইজনকে নৌকায় তুলতে পারলেও শান্ত বণিকের হাত ছুটে যায়।
আমরা পৌঁছাতে প্রায় ২০–৩০ মিনিট লাগে। সাথে সাথে ট্যুরিস্ট পুলিশ, স্থানীয় পুলিশ, বিজিবি এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করা হয়। স্থানীয় মানুষজনও অত্যন্ত সহযোগিতা করেন। স্থানীয় ডুবুরিরা দীর্ঘ সময় চেষ্টা করলেও কোনো ফল পাওয়া যায়নি।
এরপর প্রায় ২–৩ ঘণ্টা পর ফায়ার সার্ভিস আসে। সন্ধ্যার পর পানিতে নামার অনুমতি না থাকলেও ভিসি স্যারের আন্তরিক প্রচেষ্টায় তারা উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়।
প্রায় দুই ঘণ্টার অভিযান শেষে, রাত ৯:৩০টার দিকে শান্ত বণিকের নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ ক্লিয়ারেন্সসহ আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়া শেষে আমরা রাত প্রায় ৩:৩০টার দিকে মরদেহ নিয়ে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছাই। ছোট ভাইটির নিথর দেহ রাখা হয় ফ্রিজিং ইউনিটে।
পরিবার তখন ঠাকুরগাঁও থেকে রওনা দিয়েছে—১৫ থেকে ২০ ঘণ্টা সময় লাগতে পারে সিলেট পৌঁছাতে। এরপর সিদ্ধান্ত হবে ময়নাতদন্ত হবে কিনা, কিংবা ছাড়পত্র ছাড়াই মরদেহ গ্রহণ করা হবে কিনা।
মাত্র ২০–৩০ মিনিট আগেও যে ছেলেটা আমার সাথে সালাম দিয়ে হাত মিলিয়েছিল, সে এখন নিথর।
তার অকাল মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত।
মহান আল্লাহ যেন তার পরিবার ও স্বজনদের এই শোক সহ্য করার শক্তি দান করেন।
পোস্ট: Sahel Rana