17/10/2024
রবহারা জীবনের উপলব্ধি :
ব্যস্ত দুনিয়ায় এলোমেলো জীবনের কোনো এক মূহুর্তে এসে প্রতিটি মানুষ ঠিকই ভাবে, কীভাবে সময় ফুরিয়ে গেল! সেদিনের শৈশব-কৈশোর পেরিয়ে যৌবনের উত্তাপ শেষে কবে যে চুল-দাড়িতে সফেদ নিদর্শন ভেসে উঠেছে, খেয়ালই করা হয়নি। কোনো এক নিশি রাতে দূরাকাশ পানে তাকিয়ে মনে পড়ে- ‘মোহময় জীবনের মায়ায় পড়ে, ক্ষণিকের দুনিয়ার ধোঁকায় পড়ে কবেই তো ভুলে বসেছি মহান রবকে! দুনিয়াকে আপন করতে গিয়ে হারিয়ে ফেলেছি ইমানের নুর, আর জীবনের মোহে পড়ে রব থেকে সরে চলে গেছি বহুদূর!’ ভাবে আর আফসোস করে, কখনোবা হতাশায় নিজের চুল ছিড়তে ইচ্ছে করে।
কল্পনায় ভেসে ওঠে- ‘এই তো সেদিন অমুককে গালি দিলাম! তমুককে মানুষের সামনে ইচ্ছেমতো অপদস্ত করলাম!’ চোখের কোণে এখনো ভাসছে- ‘অমুকের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করলাম, তমুককে ফাসিয়ে দিলাম। আহ! কী পৈচাশিক আনন্দই না পেয়েছিলাম সেদিন! কিন্তু হায়! আজ আমার এমন লাগছে কেন? আত্মঅহমে নিমজ্জিত আমি আজ এত অসহায় বোধ করছি কেন? হায়! যাদের জন্য এত কিছু করলাম, যাদের জন্য হালাল-হারামের বাছবিচার না করে কাড়িকাড়ি অর্থ উপার্জন করলাম, তারা আজ কোথায়?’ দূরের কোনো এক নিশাচর পাখির আওয়াজে চিন্তায় ছেদ পড়ে। হঠাৎই সম্বিৎ ফিরে পায়।
চমকে উঠে ভাবে, ‘সবাই তো নিজ নিজ স্বার্থ নিয়ে চলে গেছে। কেউ আমাকে ব্যবহার করেছে, আমিও কাউকে ব্যবহার করেছি। টিস্যুর মতো। ব্যবহার শেষে সবাই ছুড়ে ফেলেছে। কেউ মনে রাখেনি। এত এত কষ্ট আর অবদানের কথা সবাই ভুলে গেছে। তাহলে কার জন্য ব্যয় করলাম জীবনের মূল্যবান সময়? শক্তি আর যৌবন? এত আয়োজন কার জন্য? কীসের স্বার্থে?’ অনুতপ্ত হৃদয় উত্তর দেয়, ‘নফসের জন্য, নফসের স্বার্থে।’ হায়! তাহলে এত আয়োজন, এত কষ্টবরণ আর ব্যস্ত জীবন—সবই বৃথা? অবৈধ উপার্জন করে, অনর্থক বিবাদে জড়িয়ে, কারও টিস্যু হয়ে দিন শেষে অর্জনের ঝুলি পুরোই শূন্য?
অনুশোচনায় অন্তর ফেটে পড়ে। হৃদয় বিগলিত হয়। চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ে একফোঁটা তপ্ত অশ্রু। ফেলে আসা অতীতের জন্য আফসোস করে ভাবে, ‘হায়! ক্ষুদ্র এ জীবনের সিংহভাগ সময়ই ব্যয় করলাম দুনিয়ার পিছনে। রবকে চিনলাম না। তাঁকে আপন করতে পারলাম না। এখন যে আমি বড়ই একা! স্ত্রী-সন্তান, আত্মীয়-স্বজন, যাদের জন্য আমার এত আয়োজন, তারা সবাই আমাকে রেখে এদিক-ওদিক চলে গেছে। যাদের ওপর জুলুম করেছিলাম, যাদের অর্থ-জমি আত্মসাৎ করেছিলাম, তারা আজ আমাকে লানত করে, ঘৃণা করে। এ জীবন বড় বিভীষিকাময়! বড্ড কষ্টের!’ এই তো জীবন। এই তো ফলাফল।
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে পাওয়া এ উপলব্ধিটুকু যদি কেউ পেয়ে যায় কৈশোরে, দুনিয়ার ব্যস্ততাকে দূরে রেখে যদি কেউ যৌবনকে উৎসর্গ করে রবের তরে, তাহলে সে কত ভাগ্যবান! তার আখিরাত কতইনা উজ্জ্বল! কিন্তু আফসোস যে, আমরা জীবন-যৌবনের কী নিদারুন অপচয় করি! কখনো দুনিয়ার মোহে, কখনোবা দ্বীনের লেবাসে ব্যক্তিস্বার্থে, কখনো অপবাদ দিয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করে, কখনোবা জালিমের টিস্যু হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে। রবকে ভুলে, দ্বীনের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে এভাবেই কেটে যাচ্ছে আমাদের দিনকাল। হায়! কবে ঘটবে আমাদের বোধদয়, আর কবেইবা ফিরব রবের পথে? সময় যে ফুরিয়ে যায়!
✒️ শায়খ আব্দুল্লাহ বিন শহিদুল্লাহ