21/04/2026
দ্বীনে ফেরা ও IOM এর সাথে পরিচয়
আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহি রব্বিল আলামিন। আল্লাহ তা'আলাই দয়া করে আমাকে তার পথ দেখিয়েছেন।
গ্রামের একটা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম আমার।ভাইবোন এর মধ্যে সবার ছোট আমি। বাবা মায়ের সাথে একাই বড় হয়েছি।বাকি ভাইবোন বিয়ে-শাদী করে স্যাটেল হয়েছে যার যার কর্মক্ষেত্রে। ইদ বা পারিবারিক আয়োজন হলে তখন সবাই বাড়িতে আসতো। আমার বাবা স্কুল টিচার ছিলেন।পারিবারিকভাবে মোটামুটি স্বাধীন ভাবেই বড় হয়েছি।ছোটবেলা থেকে চুপচাপ স্বভাবের ছিলাম। আর স্কুল কলেজের পড়াশোনার প্রতিই মনোযোগী ছিলাম।
আমাদের সমাজের মধ্যে ইসলাম বলতে ছিল পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া, রমজানে রোজা রাখা, কুরআন খতম করা, বাচ্চারা সকালে মক্তবে যাওয়া।পর্দা বলতে হাট বাজারে যাওয়ার ক্ষেত্রে বয়স্ক মহিলারা বোরকা পড়তেন। যদিও বাড়ির আশেপাশে বা ঘরে মাহরাম ননমাহরাম প্রতিবেশি বা আত্মীয়-স্বজনদের সাথে পর্দা করতো না কেউ, এমনকি তাদের সাথে পর্দা করা লাগে তাও জানতাম না। এছাড়া বিভিন্ন হারাম কাজকর্ম, বিদয়াত, কুসংস্কার প্রচলন ছিলো।ঘরের মধ্যে টিভি চালানো, মোবাইলে গান শোনা, নাটক-সিনেমা দেখার প্রচলন ছিলো। স্কুল কলেজে বেপর্দা যাওয়া আসা করতাম।
সহপাঠী ছেলেদের সাথে কথা বলা, সহশিক্ষা এসব যে হারাম তাও জানতাম না।জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য শেখানো হয়েছে ভালো রেজাল্ট করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে, চাকরী করে টাকা রোজগার করতে হবে। তো এভাবেই বড় হতে থাকি। ধর্মীয় দিক থেকে কোন কঠোরতা পরিবার থেকে দেয়া হতোনা বললেই চলে।মূলত, ছোটবেলায় মক্তব থেকে নামাজ শিক্ষা, কুরআন শিক্ষা হয়েছিলো, যদিও সহিহ শুদ্ধ ভাবে না।তবুও আলহামদুলিল্লাহ, উস্তায এর প্রতি আল্লাহ রহম করুন। আমার বাবা মা নামাজ পড়তেন, রোজা রাখতেন, গ্রামের মানুষ যেভাবে দ্বীন পালন করে সেভাবেই চলতেন। তাই অতটা আধুনিকতা বা বেপরোয়াভাবেও চলিনি।
এই অবস্থা থেকে প্রথম দ্বীনের একটু ভালো বুঝ আসে নবম শ্রেনীতে পড়া অবস্থায়, বাড়ির পাশেই এক মক্তব এ যাওয়া শুরু করি আমরা কয়েকজন, কুরআন সহীহ করার উদ্দেশ্যে। তখন মোটামুটি কিছুটা পরিবর্তন আসে। যেমন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার চেষ্টা করতাম, রমজানের সবগুলো রোজা রাখার চেষ্টা করতাম এবং বাইরে চলাফেরার সময় মাথায় কাপড় দিয়ে চলার চেষ্টা করতাম। যদিও পরিপূর্ণভাবে দ্বীনে প্রবেশ করতে পারিনি। এভাবে মক্তবে কিছুমাস পড়া শেষে একসময় পরিবর্তনগুলো থেকে হারিয়ে যাই ধীরে ধীরে। তারপর থেকে মূলত আরো বেশি জাহেলিয়াতের পথে হাঁটা শুরু হয়, তবে মনের ভিতর খুব করে চাইতাম আবার আগের মত হয়ে যাই, কিন্তু নফসের ধোঁকায়,শয়তানের ধোঁকায় তা হয়ে উঠেনি,যদিও একট ইচ্ছা করতাম যে বিয়ের পর পরিপূর্ণ ধার্মিক হয়ে যাব।ইচ্ছাটা মনের ভেতরে পুষতে থাকি, যদিও নানাবিধ গুনাহ থেকে আর নিজেকে বের করতে পারিনা। ধারাবাহিক ভাবে ২০১৯ সালে ইন্টারমিডিয়েট কমপ্লিট হয়।এরপর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাই এবং ভর্তি হই। এরপর ২বছর পর আমার পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়।বিয়ের পরেও আমি প্র্যাকটিসিং হতে পারিনি যেমনটা আগে ভেবেছিলাম, তবে আমার হাজব্যান্ড মাদ্রাসা ব্যাকগ্রাউন্ড এর ছিলো এবং আমার থেকেও দ্বীনের ক্ষেত্রে অনেকটাই এগিয়ে ছিলো। আমি তখন অনেক বেশি থ্রিলার গোয়েন্দা গল্প এবং বিভিন্ন ধরনের উপন্যাস পড়তাম। আমার হাজব্যান্ড বলতো আমি যেন ইসলামিক বই পড়ি। তো বিয়ের ৬-৭মাস পর এর ঘটনা, তখন লেখক আরিফ আজাদ ফেসবুকে অনেক পরিচিত ছিল।তাঁর দুটি বই অর্ডার করি অনলাইনে। এছাড়া তাঁর প্যারাডক্সিকাল সাজিদ বই টা ইন্টারমিডিয়েটে থাকতে পড়েছিলাম। নতুন করে এই বইগুলি পড়ার পর থেকে আমার ইসলামিক বই এর প্রতি আগ্রহ বাড়ে এবং আমি বেদ্বীন সব ধরনের বই কেনা ও পড়া বন্ধ করে দেই।আলহামদুলিল্লাহ।
আল্লাহ আমাকে আবারো নতুন করে হেদায়েত দান করেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া শুরু করি,পরিপূর্ণ না হলেও মুখ ঢেকে পর্দা করা শুরু করি, গান-বাজনা, নাটক-সিনেমা দেখা বন্ধ করে দেই। তবুও অনেক দিকেই ঘাটতি ছিলো, অনেকক্ষেত্রেই গুনাহ থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারতাম না। আল্লাহ মাফ করুন।
কিছু মাস পরে আমার ভার্সিটির ১ম বর্ষের ফাইনাল এক্সাম শুরু হলো (করোনার কারনে এক্সাম পিছিয়ে যায়)। আমার ইচ্ছে করছিল না আমি ভার্সিটিতে আর পড়াশোনা করি বা পরীক্ষা দেই। সবচেয়ে বড় কারণ মনে হয় ছিল বিয়ের পরও সংসার সামলে পড়ালেখা করা এবং আবাসিক হলে থেকে পড়াশোনা করা!যাইহোক মূলত, আল্লাহই আমার অন্তর থেকে এর প্রতি বিতৃষ্ণা তৈরি করে দিয়েছিলেন। খুব দোয়া করেছিলাম যেন ভার্সিটির পড়া বন্ধ হয়ে যায়। অবশেষে পরিবারের সবার বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে হাজব্যান্ড এর সহায়তায় ফাইনাল পরীক্ষার প্রথম এক্সামটা দিয়েই ভার্সিটির ভর্তি বাতিল করে দেই।আলহামদুলিল্লাহ। পরিবার থেকে অনেক কটু কথা শুনতে হয়েছে এই কারনে।
IOM কে প্রথম চেনা:
এরপর আমি চেয়েছিলাম কোন কলেজে ইসলামিক স্টাডিজ এর উপর ভর্তি হই,কিন্তু কোন সুযোগ ছিলোনা তখন আর,যেহেতু ভর্তির সময় শেষ। এরপর অনলাইনে ইসলামিক স্টাডিজের উপর কোন কোর্স করা যায় কিনা খুঁজছিলাম, তখনই প্রথম IOM কে জানি আমি।কিন্তু অনলাইনের অন্য কোর্সগুলোর তুলনায় IOM কে আমার অনেক বিশাল পরিসরের কঠিন এবং ব্যয়বহুল কিছু মনে হল,ফেসবুকে সার্চ করেছিলাম মূলত।ওয়েবাসাইটে ঢুকে বিস্তারিত জানা হয়নি। তারপর অনলাইনে কোর্স করার চিন্তা বাদ দিতে হয়।
কয়েকমাস পরে আমার প্রথম বাচ্চা কনসিভ হয়,এরপর থেকে বিভিন্ন অসুস্থতার অজুহাতেআমি ধীরে ধীরে আবার দ্বীন থেকে দূরে সরে যেতে থাকি।আস্তাগফিরুল্লাহ।
কিন্তু মনে মনে আশা থাকে আমি আবারো দ্বীনে ফিরবো ইনশা আল্লাহ, ফিরতে হবে আমাকে। তবুও বাচ্চা সামলিয়ে,সংসার সামলিয়ে শয়তানের ধোঁকা থেকে বের হতে পারছিলাম না।
এভাবে ২ বছর কেটে যায়। আমার বাবা প্রথমবারের মত উমরাহ করে আসেন। আসার পর দীর্ঘ ২মাস অসুস্থ থাকেন! তারপর দুনিয়া ছেড়ে চলে যান।বাবার মৃত্যুর পর দুনিয়ার মোহ অনেকটাই কাটতে শুরু করে। দুনিয়ার কোন কিছুই যেন আমাকে আর টানেনা।মৃত্যুর ভাবনা প্রতিদিন ভাবতাম। তখন আমার মধ্যে আল্লাহ আবারো হেদায়েতের নুর দান করেন।আলহামদুলিল্লাহ। বারবার পথ হারিয়ে ফেলার পর তিনিই আমাকে দয়া করে সরল পথে ফিরিয়ে আনেন।
আল্লাহর তাওফিকে ধীরে ধীরে দ্বীনের পথে ফেরা শুরু করি।দ্বীনি বই পুস্তক কিনতে থাকি এবং পড়তে শুরু করি। এভাবে দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করার প্রতি আরো বেশি আগ্রহ তৈরি হয়। যদিও আমলে ইবাদতে পরিশুদ্ধির অনেক ঘাটতি আছে। আল্লাহর কাছে আরো বেশি থেকে বেশি হেদায়েত চাই।
ফাইনালি IOM এর পথে যাত্রা:
২০ তারিখ অক্টোবর মাস।হটাৎ করে আরবি ভাষা শিখার জন্য অনেক বেশি আগ্রহ অনুভব করি, তার জন্য অনলাইনে আরবী ভাষা শিক্ষা কোর্স খুঁজি, তখনই IOM কে দ্বিতীয়বারের মতো আবিষ্কার করি। আরো ঘাঁটাঘাঁটি করার পর মনে হলো 'আলিম' কোর্স টা তো আমার জন্য অনেক দারুণ হবে, আরবী ভাষা শিখাও হবে,ইসলামিক স্টাডিজ কোর্স ও হবে। মাশা আল্লাহ!
তারপর ২/১ দিনের মধ্যেই আমি আল্লাহর কাছে ইস্তেখারা করি, দুআ করি। যেন, এই কোর্স টা আমার জন্য উত্তম হলে আল্লাহ আমাকে এখানে ভর্তির তাওফিক দান করে। তারপর ইতিবাচক অনুভব করি এবং শুধুমাত্র হাজব্যান্ড কে জানিয়ে আল্লাহর ইচ্ছায় ভর্তি হয়ে যাই। আল্লাহু আকবার! এইবার ভর্তি ফি বা কোর্স এর খরচ আমার কাছে এত কম মনে হয়েছিলো যে আমি ভাবলাম এটা তো কত কম খরচে কত উত্তম কিছু!!! অথচ প্রথমবার কি ব্যয়বহুল মনে হয়েছিলো! আসলে আল্লাহ যখন যা উপযুক্ত মনে করেন।
এরপর থেকেই আমার জার্ণি শুরু দ্বীন শিক্ষার পথে,IOM এর সাথে।
আমি একটা কথা এখানে যুক্ত করতে চাই যে, ভর্তি হওয়ার আগে আমি কয়েকটা বিষয় নিয়ে আলেমদেরকে নিয়ে অনেক বেশি দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে ছিলাম, এক আলেম এক কথা বলেন, কার কথা শুনবো, কাকে অনুসরণ করবো কিছুই বুঝছিলাম না।আল্লাহর কাছে অনেক দুআ করতাম যে তিনি যেন আমাকে সরল সঠিক পথ দেখান, যারা হক্বের উপর আছে তাদেরকে অনুসরণ করার তাওফিক দান করেন।
আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ।
IOM এ ভর্তি হবার পর মনে হচ্ছে আল্লাহ আমার দুআ কবুল করেছেন।
আল্লাহ যেন চিরজীবন আমাকে ইলমে দ্বীনের সাথে যুক্ত থাকার তাওফিক দান করেন, ইলম অনুযায়ী আমল করে ইহকাল ও পরকালে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করার তাওফিক দান করেন।এছাড়া, আমি যেন আমার পরিবার, সমাজের মানুষকে দ্বীনের পথে চলার অনুপ্রেরণা হতে পারি, দাওয়াত দিতে পারি সেই তাওফিক চাই।
আমিন।
~ ২৬১৫ ব্যাচের একজন বোনের দ্বীনে ফেরার গল্প