26/09/2026
** ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্দেশে বিদ্যাসাগর: এক জীবন্ত প্রেরণার উৎস :
মহাকালের বুকে কিছু জীবন থাকে যা কেবল ইতিহাসের পাতায় বন্দি না থেকে, প্রতিটি প্রজন্মের হৃদয়ে প্রদীপ্ত মশালের মতো জ্বলতে থাকে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তেমনই এক জীবন্ত অগ্নিশিখা, যাঁর আলোয় আজও পথ চেনে বাংলার শিক্ষা-সমাজ।
১. দারিদ্র্যের অন্ধকারে জ্ঞানের প্রদীপ :
আজ আমাদের হাতে আধুনিক প্রযুক্তি, ঝলমলে বইয়ের তাক, সুশীতল পাঠাগার—কিন্তু একবার ফিরে তাকাই সেই দিনগুলিতে, যখন মেদিনীপুরের এক নিঃস্ব কুটিরে জন্ম নিয়েছিলেন এক বালক, যাঁর কাছে বই কেনার সামর্থ্য ছিল না, ছিল না রাতের প্রদীপ জ্বালানোর তেলটুকুও। কলকাতার রাজপথে গ্যাসবাতির নিভু নিভু আলোয় বসে যে বালক অক্ষর চিনেছেন, বন্ধুর কাছে বই চেয়ে এনে সারা রাত জেগে খাতায় টুকে নিয়েছেন পাঠ—সেই দারিদ্র্যই যেন হয়ে উঠেছিল তাঁর সবচেয়ে বড় শিক্ষক। অভাব তাঁকে দমাতে পারেনি, বরং তাঁর জ্ঞানপিপাসাকে করে তুলেছিল আরও তীব্র, আরও অদম্য। সংস্কৃত কলেজের পণ্ডিতসমাজ যখন তাঁর অসামান্য পাণ্ডিত্যে মুগ্ধ হয়ে তাঁকে ভূষিত করলেন ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধিতে, তখন যেন প্রমাণিত হলো—দারিদ্র্য মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করে না, নির্ধারণ করে তার আত্মার অদম্য জেদ।
২. অন্ধকার ঘুচিয়ে বর্ণের আলো :
একটি জাতির ভবিষ্যৎ লুকিয়ে থাকে তার শিশুদের প্রথম পাঠে—এই সত্য গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন বিদ্যাসাগর। তাই তিনি হাতে তুলে নিলেন কলম, বাংলা বর্ণমালাকে দিলেন নতুন কাঠামো, রচনা করলেন কালজয়ী ‘বর্ণপরিচয়’। ‘বোধোদয়’, ‘কথামালা’, ‘ঋজুপাঠ’—এই গ্রন্থগুলি শুধু পাঠ্যবই নয়, হয়ে উঠল বাংলার শিশুমনে আলো জ্বালানোর প্রথম দীপশিখা। শুধু লেখনীতেই থেমে থাকেননি তিনি—গ্রামে গ্রামে গড়ে তুলেছেন স্কুল, আর যে যুগে কন্যাসন্তানের শিক্ষা ছিল সমাজের চোখে অবহেলার বিষয়, সেই অন্ধকার যুগেই তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন অসংখ্য বালিকা বিদ্যালয়—নারীশিক্ষার আলোকবর্তিকা হাতে নিয়ে।
৩. করুণার সাগর, সংস্কারের অগ্রদূত :
শাস্ত্রের গভীর পাণ্ডিত্য আর মানবতার উষ্ণ হৃদয়—এই দুই বিরল গুণের অপূর্ব মিলন ঘটেছিল বিদ্যাসাগরের চরিত্রে। যে সমাজ বিধবাদের জীবনকে করে তুলেছিল এক নিরন্তর যন্ত্রণা, সেই কুপ্রথার বিরুদ্ধে শাস্ত্রের অস্ত্র দিয়েই তিনি লড়াই করলেন, আর ১৮৫৬ সালে বিধবাবিবাহকে করলেন আইনসিদ্ধ। শুধু কথায় নয়, নিজ পুত্রের বিবাহ এক বিধবাকন্যার সঙ্গে দিয়ে তিনি সমাজের সামনে স্থাপন করলেন এক অবিস্মরণীয় দৃষ্টান্ত। আর তাঁর করুণা? অর্থাভাবে যেন কোনো ছাত্রের শিক্ষা থমকে না যায়, ক্ষুধার্ত-পীড়িত মানুষের পাশে যেন তিনি সর্বদা দাঁড়িয়ে থাকেন—এই মানবিকতার জন্যই মানুষ তাঁকে ভালোবেসে ডাকত ‘দয়ার সাগর’।
৪. মেরুদণ্ড সোজা রাখা এক মহাপুরুষ :
আর সবশেষে, যে শিক্ষা বিদ্যাসাগরের জীবন থেকে আমাদের সবচেয়ে বেশি নেওয়া দরকার, তা হলো আত্মমর্যাদা। পরাধীন ভারতে ইংরেজ শাসনের অধীনে চাকরি করেও তিনি কখনো নিজের নীতি-আদর্শের কাছে মাথা নত করেননি। অন্যায়ের সামনে নতজানু না হয়ে সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষের সম্মানজনক পদ ত্যাগ করতেও তাঁর হাত কাঁপেনি এতটুকু। এই আত্মসম্মানবোধই তাঁকে করে তুলেছে চিরকালের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।