29/06/2026
স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের ১৬৩-তম জন্মজয়ন্তীতে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্যকে খোলা চিঠি।
-----------------------------------------------------------------------------
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্যের নিকট খোলা চিঠি
মাননীয় মহাশয়,
স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের ১৬৩-তম জন্ম জয়ন্তীতে আপনাকে এই খোলা চিঠি দেওয়ার তাগিদ আমরা অনুভব করছি। একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, স্যার আশুতোষ ১৯০৬ সাল থেকে ১৯১৪ এবং ১৯২১ সাল থেকে ১৯২৩ সাল—এই দুই পর্বে উপাচার্য থাকাকালীন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে আধুনিক ভারতীয় শিক্ষার ভিত্তি স্থাপনা করেছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে তিনি নিছক একটি পরীক্ষা পরিচালনকারী সংস্থা থেকে একটি বিশ্বমানের গবেষণা ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উন্নীত করেছিলেন। ১৯২৩ সালে লর্ড লিটন-কে লেখা তাঁর চিঠি ভারতের উচ্চশিক্ষার ইতিহাসের এক অনন্য উদাহরণ হিসাবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। লর্ড লিটন স্যার আশুতোষের নিকট সরকারের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ না করার আশ্বাস চেয়েছিলেন এবং বিনিময়ে উপাচার্য হিসাবে তাঁকে পুনর্নিয়োগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর সম্মতি আদায়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। প্রত্যুত্তরে স্যার আশুতোষ বলেছিলেন - ‘----- একজন সম্মানীয় ব্যক্তি যে উত্তর পাঠাতে পারেন আমি নিঃসঙ্কোচে সেটাই আপনাকে পাঠাচ্ছি - এমন একটি উত্তর যা আপনি এবং আপনার উপদেষ্টারা প্রত্যাশা ও আকাঙ্খা করেন, আপনি আমাকে যে অপমানজনক প্রস্তাব দিয়েছেন, আমি তা প্রত্যাখ্যান করছি।' ব্রিটিশ ভারতে প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতার এক অত্যন্ত সঙ্কটজনক মুহুর্তে স্যার আশুতোষ গর্জে উঠেছিলেন, করেছিলেন সেই অমোঘ উক্তি - 'freedom first, freedom second, freedom always.'
স্যার আশুতোষ হৃদয় দিয়ে বিশ্বাস করতেন যে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রদত্ত পাশ্চাত্য আধুনিক শিক্ষাকে জাতীয় স্বার্থে ব্যবহার করা সম্ভব।সেই লক্ষ্যেই ১৯০৮ সালে তিনি তৈরী করেছিলেন Calcutta Mathematical Society, ১৯১৪ সালে তিনি রাজাবাজার বিজ্ঞান কলেজ বা University College of Science, Technology and Agriculture- প্রতিষ্ঠা করেন। বিজ্ঞান গবেষণার প্রসারের জন্য সিভি রমন ও আচার্য্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়-এর মতো প্রথিতযশা অধ্যাপকদের বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ করেন তিনি। নামী ও গুণী শিক্ষকদের বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ করার সাথে সাথে তিনি ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণান ও শ্রীনিবাস রামানুজন-এর মতো প্রতিভাধরদের আবিষ্কার ও লালন করেছিলেন। ১৯১৬ সালে স্থাপনা করেছিলেন South Suburban College (বর্তমানের আশুতোষ কলেজ)। পাশাপাশি ব্রিটিশদের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও তিনি মাতৃভাষার মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু করেছেন বাংলা, হিন্দী ও উর্দূ বিভাগ। ১৯১৪ সালে Indian Science Congress-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতিও ছিলেন তিনি।
মহাশয়, স্যার আশুতোষ সম্পর্কে এই সব কথা যা এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করা হ'ল কিংবা তাঁর চারিত্রিক দৃঢ়তা সম্পর্কিত আরো অনেক কথা যা এখানে বলা হ'ল না এসব কথা কারো যে অজানা আছে সেই ভেবে এই লেখার অবতারনা আমরা করিনি। আসলে আমাদের দেশ, আমাদের রাজ্য এমন সময়কালে উপনীত হয়েছে যখন স্যার আশুতোষের জীবন নিয়ে শিক্ষাঙ্গণের পরিধিতে ও বাইরে বেশী বেশী করে চর্চা হওয়া প্রয়োজন।
★ কেন আজ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্ব ক্রমতালিকায় ক্রমশঃ পিছনের দিকে যাচ্ছে, এই প্রশ্ন আমাদের সকলকেই ব্যথিত করে।
★ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিপুল পরিমান শিক্ষক- শিক্ষাকর্মীর পদ শূণ্য, এই শিক্ষক-শিক্ষাকর্মী নিয়োগ কবে হবে?
★ গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত টাকার সংস্থান কবে হবে?
★ ল্যাব ও লাইব্রেরী উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ বাড়বে না অবান্তর মামলার খরচ হিসাবে ব্যয় হবে লক্ষ লক্ষ টাকা?
★ মধুপরে প্রাক্তন আচার্য্য হরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের দানকৃত বাড়িটি বিশ্ববিদ্যালেয় হস্তচ্যুত কেন হতে চলেছে, কে নেবে এর দায়?
★ প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে ডিলিট দেওয়া নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্দরে যেমন প্রশ্ন ছিল, এই প্রশ্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে আজও ওঠে। ক্ষমতা কি এই প্রশ্নগুলোকে চিরকাল স্তিমিত করে রাখতে পারবে?
★ কেন আজ অবধি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপসারিত ফিনান্স অফিসারের মামলা নিষ্পত্তি ঘটলো না?
★ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব Corpus fund-এর কি পরিস্থিতি তা নিয়ে কেন শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হচ্ছে না?
★ কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে মমতা ব্যানার্জীর লেখা লক্ষ লক্ষ টাকার বই কেনার বরাত কিভাবে দেওয়া হয়েছিল?
এই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসাবে আমরা আপনার উত্তরের প্রত্যাশায় রইলাম।
পরিশেষে জানাই, বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সঙ্কটকাল থেকে উত্তরণের চলমান আলোকবর্তিকা হিসাবে স্যার আশুতোষ আমাদের হৃদয়ে ছিলেন, আছেন এবং আগামীদিনেও থাকবেন।
আপনার বিশ্বস্ত,
সুদীপ্ত ব্যানার্জী সোমনাথ সাহা
সভাপতি সাধারণ সম্পাদক
২৯.০৬.২৫