29/05/2026
মেয়েটিকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনতাম না। পরে জানলাম, সে জনপ্রিয় কন্টেন্ট ক্রিয়েটর সায়নী চক্রবর্তী। প্রাণোচ্ছল, হাসিখুশি, জীবপ্রেমী এক মানুষ। তার কন্টেন্টের মূল চরিত্র ছিল প্রাণীরা - "সুন্দরী" নামের গরু, পোষ্য কুকুর, অবলা কিছু প্রাণ, যাদের সে নিজের সন্তানের মতো আগলে রাখত। তার বায়োতে বড় বড় অক্ষরে লেখা ছিল - "জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।"
তাই যখন শুনলাম এমন জীবনমুখী, আলো ছড়ানো একটি মেয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে, সত্যিই থমকে গেলাম।
এই সপ্তাহেই এ নিয়ে দ্বিতীয় আত্মহত্যার খবর। পরিচালক অনীক দত্তের পর আবার এক তরতাজা প্রাণ নিভে গেল। কতই বা বয়স হয়েছিল মেয়েটির? জীবন তো তখনও ঠিকমতো শুরুই হয়নি। কত স্বপ্ন ছিল, কত গল্প বাকি ছিল, কত কিছু দেখার ছিল, বাঁচার ছিল। সব শেষ ।
তারপর ভাবতে বসে মনে হলো, আসলে আমরা সবাই ধীরে ধীরে ভীষণ যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছি। চারদিকে এত ব্যস্ততা, এত দৌড়, এত ট্রেন্ড, এত স্ক্রল, এত শব্দ - চারদিকে এত ডিস্ট্রাকশন, যে মানুষের ভেতরের নিঃশব্দ কান্নাগুলো আর শুনতেই পাই না। আমরা সারাক্ষণ সংযুক্ত, অথচ ভীষণ বিচ্ছিন্ন। আমরা সবাই ধীরে ধীরে বেশি আত্মকেন্দ্রিক ও একাকী হয়ে উঠছি।
নইলে ভাবুন তো মানুষের একটা মনের কথা বলার লোকও নেই, বেছে নিচ্ছে ChatGPT-এর মত AI মডেলগুলিকে, মানুষ আর মানুষের কথা শোনে না, অদ্ভুত না?
বন্ধুদের আড্ডায় বসেও আমরা রিল স্ক্রল করি, কিন্তু পাশে বসে থাকা মানুষটার মনের খবরটা নিই না।
শেষ কবে কাউকে মন খুলে জিজ্ঞেস করেছেন - "তুই সত্যিই ভালো আছিস তো?", শেষ কবে কারও কাঁধে হাত রেখে বলেছিলেন - "কিছু হলে বলিস, আমি আছি"?
শেষ কবে আপনার প্রিয় মানুষ, কাছের মানুষ, বন্ধু, পরিবারের কেউ - তাদের মনের খোঁজ নিয়েছিলেন? বা তারাও নিয়েছিল?
আজকাল মানুষ দুদিন মন দিয়ে কথা শোনে, তৃতীয় দিনেই বিরক্ত হয়ে যায়। আমরা সবাই যেন একটু বেশিই আত্মকেন্দ্রিক ও অকারণে ব্যস্ত হয়ে উঠেছি। নিজের ক্লান্তি, নিজের সমস্যা, নিজের ব্যস্ততার ভিড়ে অন্য মানুষের ভাঙচুরগুলো চোখেই পড়ে না। অথচ এই একাকীত্বই ধীরে ধীরে মানুষকে ভেতর থেকে শেষ করে দেয়।
ইমরান খানের একটা উক্তি বারবার মনে পড়ে -
"মানুষ মারা যায় কখন জানিস? যখন এই পৃথিবীর কাছে তার প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়, বা তার কাছে পৃথিবীর।"
কথাটা হয়তো পুরোপুরি সত্যি নয়, কিন্তু ভীষণ নির্মম। কারণ মানুষ শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বাঁচতে চায়। কেউ না কেউ তাকে একটু জড়িয়ে ধরুক, একটু শুনুক, একটু বলুক - "থাক, সব ঠিক হয়ে যাবে।"
হয়তো অনীক দত্তও শেষবার দরজায় টোকা দিয়েছিলেন, তারপরে ছাদে চলে গেলেন।
হয়তো সায়নীও কারও কাছে হাত বাড়িয়েছিল।
হয়তো তারা কাউকে খুব দরকার ছিল সেই মুহূর্তে।
কিন্তু আমরা কেউ বুঝিনি।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝলমলে হাসির আড়ালে কত গভীর অন্ধকার লুকিয়ে থাকতে পারে, আমরা বুঝতেই পারি না। যে মানুষটা সবাইকে আনন্দ দেয়, সেও হয়তো রাতে নিঃশব্দে ভেঙে পড়ে। মনের অসুখ সত্যিই বড় অসুখ। শরীরের ক্ষত চোখে দেখা যায়, কিন্তু মনের ক্ষতগুলো নীরবে মানুষকে শেষ করে দেয়। এর থেকে মুক্তির পথ অনেকেই খুঁজে পায়না, তারা এভাবে হারিয়ে যায়।
তাই আজ খুব বলতে ইচ্ছে করছে -
আপনার কাছের মানুষদের একটু সময় দিন।
শুধু "কি খবর?" জিজ্ঞেস করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। কখনও জিজ্ঞেস করুন - "কি রে কেমন আছিস? সব ঠিকঠাক?" কারও আচরণ বদলে গেলে তাকে "ড্রামা" বলার আগে একবার তার পাশে বসুন, একটু কথা শুনুন, কিছু বলার দরকার নেই, কিছু মানুষ কখনো শুধুই এটাই চায় তাদের কথা কেউ একটু শুনুক। সবাই শক্ত থাকার অভিনয় করতে করতে একসময় সত্যিই ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
এই পৃথিবীটা আজ বড় বেশি কঠিন হয়ে গেছে। তাই আমাদের আরও একটু নরম হওয়া দরকার। দুনিয়াটাকে একটু নরম চোখে দেখা দরকার ।
আরও একটু মন দিয়ে শোনা দরকার।
আরও একটু মানুষ হওয়া দরকার।
সায়নী,
তারাদের দেশে ভালো থেকো। আলো হয়ে থেকো।
এই পৃথিবী হয়তো তোমাকে খুব বেশি আলো দিতে পারেনি, অন্ধকারই দিয়েছে, ওপারে না হয় শুধুই আলো হোক।
তোমার অসমাপ্ত ভালোবাসাগুলো, তোমার প্রাণীদের প্রতি মমতা, তোমার হাসি - সব রয়ে যাবে মানুষের মনে।
~ অপূর্ব ©