28/10/2025
“আবার দেখা” — অনন্যার গল্প
আমি ভেবেছিলাম, কিছু মানুষকে জীবন থেকে চিরতরে হারিয়ে ফেললে, তাদের নামটাও ভুলে যাওয়া যায়।
কিন্তু না, কিছু নাম ঠিক কানের ভেতর বাজতে থাকে —
যেমন রবি।
আমরা একসময় কলেজে একসঙ্গে পড়তাম।
ছোট শহর, ছোট স্বপ্ন — কিন্তু ওর হাসিটা ছিল বড়, অনেক বড়।
আমাদের সম্পর্কটা ছিল খুব স্বাভাবিক, খুব সহজ... যতক্ষণ না জীবন একটু জটিল হয়ে গেল।
সময় বদলালো। আমি চাকরি পেলাম, সংসার করলাম, মা হলাম।
রবিও নিজের জীবন গুছিয়ে নিল, তারও একটা পরিবার আছে।
সবকিছু স্বাভাবিক, ঠিকঠাক, শান্ত।
তারপর একদিন, নতুন অফিসে যোগ দিতে গিয়ে দেখি —
ডেস্কের উল্টো পাশে বসে আছে রবি।
প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারিনি।
ওর চোখে সেই আগের মায়া নেই, কিন্তু একরাশ ক্লান্তি আর গভীর একটা নীরবতা আছে,
যেটা আমি চিনি — কারণ সেটাই একসময় আমার জন্য ছিল।
প্রথম কয়েকদিন আমরা কেবল পেশাগত কথা বলতাম।
ফাইল, রিপোর্ট, প্রজেক্ট।
কিন্তু মাঝেমধ্যে আমি ওর দিকে তাকাতাম,
দেখতাম, ও এখনও চা খায় বিনা দুধে, যেমনটা কলেজে খেত।
একদিন আমি মজা করে বলেছিলাম,
“তুমি এখনো চা-তে দুধ দাও না?”
ও শুধু তাকিয়ে হেসেছিল — সেই পুরোনো হাসি,
যেটা একসময় আমার ভেতরের পৃথিবিটা বদলে দিত।
দিন কেটে যাচ্ছিল।
প্রজেক্টের কাজের অজুহাতে আমরা একসঙ্গে বেশি সময় কাটাতে লাগলাম।
ওর কথা, ওর ভঙ্গি — সব যেন ফিরে আসছিল ধীরে ধীরে।
আমি জানতাম, এটা ভুল,
তবু কখনও কখনও ভুলও আশ্রয়ের মতো লাগে।
এক সন্ধ্যায়, অফিস শেষে আমরা একসঙ্গে বেরোলাম।
রবি হঠাৎ বলল,
“অনন্যা, যদি সময়টা ফিরিয়ে আনা যেত?”
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলাম।
তারপর বলেছিলাম,
“তাহলে হয়তো আজও আমরা একসঙ্গে থাকতাম… কিন্তু হয়তো এই মুহূর্তটার মূল্যটা বুঝতাম না।”
আমরা হাঁটছিলাম মেদিনীপুরের রাস্তায়,
আলোর নিচে আমাদের ছায়া দুই দিকে চলে যাচ্ছিল —
কিন্তু মনে হচ্ছিল, হৃদয় দুটো এক জায়গায়ই থেকে গেছে।
ওর সঙ্গে এখনো আমার প্রতিদিন দেখা হয়।
অফিসে, মিটিংয়ে, কফির পাশে।
আমরা দুজনেই জানি — এই গল্পের কোনো পরিণতি নেই।
তবু প্রতিদিন, আমি ওর পাশে বসে অনুভব করি,
ভালোবাসা কখনো মরে না —
শুধু বদলে যায়, একটু নীরব, একটু দূরত্বে থেকে বাঁচতে শেখে।