24/09/2020
'মারিয়ানা ট্রেঞ্চ' দা মিস্ট্রি
***************************************
আজ থেকে কোটি কোটি বছর আগে মহাবিশ্বে জন্ম নিয়েছিল আমাদের মাতৃতুল্য পৃথিবী। ক্ষুদ্র স্কেলে অর্থাৎ আমাদের চোখের স্বাভাবিক দৃষ্টিতে পৃথিবীকে বৃহদাকৃতির মনে হলেও, মহাজাগতিক স্কেলে ফেললে পৃথিবী এক নিতান্তই ছোট্ট বস্তু। এই পৃথিবীর বুকে রয়েছে মহাসাগর আর মহাদেশ। মানব সংস্কৃতিতেও সমুদ্রের গুরুত্ব অসীম। হোমারের ওডিসি মহাকাব্যের যুগ থেকে সাহিত্যে, সামুদ্রিক শিল্পকলায়, থিয়েটারে ও উচ্চাঙ্গ সংগীতে সমুদ্রের উপস্থিতি লক্ষণীয়। পৌরাণিক সাহিত্যের কয়েকটি ক্ষেত্রে সমুদ্র প্রতীকীভাবে দৈত্য হিসেবে চিত্রিত হয়েছে এবং অচেতন মন ও স্বপ্ন ব্যাখ্যার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।
উদ্ভিদ ও প্রাণীদের বেশ কিছু প্রধান গোষ্ঠীর বিবর্তন ঘটেছে সমুদ্রে। জীবনের উৎপত্তিও সম্ভবত সমুদ্রেই ঘটেছিল। সমুদ্রের গভীরতর অংশে লবণাক্ততা বেশি। যদিও বিভিন্ন মহাসাগরগুলির মধ্যে দ্রবীভূত লবনের আপেক্ষিক অনুপাতের পার্থক্য কমই হয়। প্রাচীন কাল থেকেই মানুষ সমুদ্র পরিভ্রমণ করছে ও সমুদ্রাভিযান চালিয়ে আসছে। সমুদ্র বা মহাসাগর হল লবণাক্ত জলের পরস্পর সংযুক্ত জলরাশি, যা পৃথিবীর উপরিতলের ৭০ শতাংশেরও বেশি অংশ আবৃত করে রেখেছে। এই অসীম ব্যাপ্তি মহাসাগরের জলের মধ্যেই রয়েছে বিপুল রহস্যের সন্ধান। মারিয়ানা ট্রেঞ্চ এমনই একটি জায়গা, যা বিজ্ঞান-প্রযুক্তিকে প্রতিমুহূর্তে ছুঁড়ে দিচ্ছে চ্যালেঞ্জ, এটিকে নিয়ে গবেষণা করার জন্য।মারিয়ানা ট্রেঞ্চ সম্পর্কে আজও পুরোপুরি জানা হয়নি বলেই পৃথিবীর মানুষের কাছে আজও আকর্ষণীয় ও বিস্ময়কর স্থান এটি।
প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিম প্রান্তে মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জের ঠিক পূর্বের তলদেশে অবস্থিত বিশ্বের গভীরতম একটি সমুদ্র খাত ‘মারিয়ানা’! এই মারিয়ানা খাতটি একটি বৃত্তচাপের ন্যায় উত্তর-পূর্ব থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে প্রায় ২৫৫০ কিমি পর্যন্ত বিস্তৃত এবং যার গড় বিস্তার প্রায় ৭০ কিমি। এই পরিখাটির দক্ষিণ প্রান্তসীমায় গুয়াম দ্বীপের ৩৪০ কিমি দক্ষিণ-পশ্চিমে পৃথিবীপৃষ্ঠের গভীরতম বিন্দু ‘চ্যালেঞ্জার ডিপ’ অবস্থিত, যার গভীরতা প্রায় ১১,০৩৪ মিটার। চ্যালেঞ্জার ডিপের সবচেয়ে কাছের স্থলভাগটির নাম ফাইস দ্বীপ। এটি চ্যালেঞ্জার ডিপ থেকে ২৮৯ কিলোমিটার (১৮০ মাইল) দক্ষিণপশ্চিমে অবস্থিত।
এইচ এম এস চ্যালেঞ্জার-২ নামক জাহাজের নাবিকেরাই ১৯৪৮ সালে এই বিন্দুটি আবিষ্কার করেন বলে, বিন্দুটির নামকরণ করা হয়েছে এই ব্রিটিশ জাহাজের নামেই। বিন্দুটির গভীরতা বোঝাতে উদাহরণ স্বরূপ বলা হয়, মাউন্ট এভারেস্টকে যদি এর মধ্যে বসিয়ে দেওয়া যায় তা হলে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে আরও প্রায় দু’কিমি নিচে পৌঁছতে হবে এভারেস্টের চুড়াকে স্পর্শ করতে। অর্থাৎ নিমেষেই মাউন্ট এভারেস্টের মতো পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ কে গ্রাস করে নেওয়ার যথেষ্ট ক্ষমতা রাখে V আকৃতির এই ট্রেঞ্চ বা সমুদ্রখাতটি।
পাতসংস্থান তত্ত্ব অনুযায়ী, অভিসারী পাত সীমানা বরাবর নিমজ্জন বা অধোগমন (Subduction) নামক ভৌগলিক প্রক্রিয়ার ফলে Oceanic Trench বা সমুদ্রখাতের সৃষ্টি হয়। এই Oceanic Trench হল গভীর সমুদ্রের মাঝে বা প্রান্তভাগে অবস্থিত সুগভীর, অতলস্পর্শী, সংকীর্ণ, অবনমিত অংশ। এই সমুদ্রখাতের সংকীর্ণ ও গভীর অংশকে Deep/Depth বলা হয়। পাতসংস্থান মতবাদ অনুসারে, ভারী মহাসাগরীয় পাত ও হালকা মহাদেশীয় পাতের বা দুটি ভিন্ন ঘনত্বের মহাসাগরীয় পাতের মুখোমুখি সংঘর্ষে ভারী পাতটি হালকা পাতের নিচে অনুপ্রবেশ করলে অধঃপাত অঞ্চল নিমজ্জিত পাতটি বসে গিয়ে সমুদ্র খাত সৃষ্টি করে। ফিলিপাইন পাতের সাথে প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাতের মুখোমুখি সংঘর্ষের ফলে ভারী প্রশান্ত মহাসাগরীয় পাত তুলনামূলকভাবে হালকা ফিলিপাইন পাতের নিচে চলে যায়। ফলে অধঃপাত অঞ্চলে নিমজ্জিত ফিলিপাইন পাতটি প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশে পৃথিবীর গভীরতম মারিয়ানা ট্রেঞ্চের সৃষ্টি করে।
এখন আমাদের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে যে, পৃথিবীর গভীরতম খাতের নাম মারিয়ানা কেন হল? চলুন জেনে নেওয়া যাক -- সপ্তদশ শতাব্দীতে স্পেনের রাজা ছিলেন চতুর্থ ফিলিপ। এই চতুর্থ ফিলিপের নেতৃত্বে ১৬৬৭ সালে স্পেনীয়ার্ডরা প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপের কিছু কিছু দখল করে এবং সেখানে তাদের উপনিবেশ স্থাপন করে। উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিম অংশে এই দ্বীপগুলি আসলে ডুবে থাকা কিছু ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির চূড়া। স্পেনীয়ার্ডরা তাদের রাজা চতুর্থ ফিলিপের স্ত্রী মারিয়ানার নামে সেই উপনিবেশের নামকরণ করেন 'লা-মারিয়ানাস'। পরবর্তীকালে স্পেনের রানী মারিয়ানার নামেই প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপপুঞ্জ গুলির নামকরণ করা হয়েছিল এবং কালক্রমে সেই থেকেই মারিয়ানা ট্রেঞ্চের নামকরণ হয়।
যাইহোক, এখন আমরা পৌঁছে যাব রহস্য-রোমাঞ্চে পরিপূর্ণ, নিকষ কালো অন্ধকার মারিয়ানা খাতের একেবারে শেষ সীমানায়-
আমরা জানি, সমুদ্র জলের পৃষ্ঠতল থেকে প্রথম ২০০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত অংশে সৌরশক্তির ৯০% প্রত্যক্ষভাবে শোষিত হওয়ায় এবং পরিবহন প্রক্রিয়া সবচেয়ে বেশি হওয়ায় জলের উষ্ণতা সর্বদা বেশি থাকে প্রায় (১৬ থেকে ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস)। একে ফোটিক অঞ্চল বা আলোকময় অঞ্চল বলে। এখানে অধিকাংশ সামুদ্রিক জীব বসবাস করে। ২০০ মিটার নিচে সমুদ্র জলের ৮০% এলাকায় সূর্যালোক প্রবেশ করতে না পারায় উষ্ণতা সর্বদা ৪.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কম থাকে একে আফোটিক অঞ্চল বলে। তাই খুব স্বাভাবিকভাবেই চ্যালেঞ্জার ডিপ পর্যন্ত সূর্যালোক পৌঁছানোর মিনিমাম সম্ভাবনা টুকুও নেই! যেখানে তাপমাত্রা ঘোরাফেরা করে ১ ডিগ্রি থেকে ৪ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের কাছাকাছি।
সমুদ্রের এত গভীরে জলের ঘনত্ব স্বাভাবিকের চেয়ে ৫% বেশি ও জলস্তম্ভের চাপও স্বাভাবিকের তুলনায় অত্যন্ত বেশি। প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে এই চাপের পরিমাণ প্রায় ৮-১০ টনের কাছাকাছি। সমুদ্রতলের স্বাভাবিক বায়ুমণ্ডলীয় চাপকে যদি এর সাথে তুলনা করা হয়, তবে বলতে হয় এই পরিমাপটি প্রায় ১০০০ গুণ বেশি। কারণ, গভীরতা যতই বৃদ্ধি পায়, জলের চাপও ততই বাড়তে থাকে। অধিকাংশ সমুদ্রবিজ্ঞানীদের মতে, জলস্তম্ভের এত প্রবল চাপে কোন প্রাণী জীবিত থাকতে পারেনা। কারণ, অত্যাধিক চাপের ফলে ক্যালসিয়াম দ্রবীভূত হয়ে যায় আর ক্যালসিয়াম দ্রবীভূত হয়ে গেলে প্রাণীর হাড়ের গঠনও অসম্ভব।
কিন্তু, প্রকৃতি বিজ্ঞানীদের এই ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করেছে। অত্যাশ্চর্যজনকভাবে মারিয়ানা ট্রেঞ্চের এত গভীরেও কিছু অদ্ভুত প্রাণীর সন্ধান পাওয়া গেছে, যারা বেমালুম অভিযোজিত হয়ে বংশবিস্তার করে চলেছে সমুদ্রের এত নিচে প্রতিকূল পরিবেশেও। মারিয়ানার তলদেশের বৈচিত্র্যময় অদ্ভুত বাসিন্দারা জলের ঠান্ডা, গরম এবং অতিরিক্ত চাপময় পরিবেশের মধ্যে বেঁচে থাকতে পারে। এই প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার জন্য এদের শরীর বিশেষ ধরনের প্রোটিন দিয়ে গঠিত। এই জীবগুলির আয়ু সাধারণত ১০০ বছরেরও বেশি হয়ে থাকে। বিজ্ঞানীরা এই জীবগুলিকে পৃথিবীর প্রাগৈতিহাসিক জীবের নমুনা বলে মনে করেন।
চলুন জেনে নেওয়া যাক সেই রকম কয়েকটি অদ্ভুত প্রাণী সম্পর্কে --
★ হ্যাচেট ফিসঃ- অনেকটা কুঠারের মতন দেখতে হওয়ায় এই মাছের নামকরণ করা হয়েছে হ্যাচেট ফিস বা কুঠার মাছ। শিকার করতে এবং শিকারীর হাত থেকে রক্ষা পেতে বিভিন্ন ছদ্মবেশ ধারণের মাধ্যমে এরা নিজেদের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখে। বিশেষ বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ্য, এরা খুব সহজেই শিকারকে বিভ্রান্ত করে তুলতে পারে!
★ ডাম্বো অক্টোপাসঃ- ওয়াল্ট ডিজনির নাম শোনেননি অথচ কার্টুন ভালোবাসেন এমন মানুষ প্রায় নেই বললেই চলে। সেই স্যার ওয়াল্ট ডিজনি সৃষ্ট বিখ্যাত চরিত্র ‘ডাম্বো’ হাতির মত দেখতে হওয়ায় এই প্রজাতির অক্টোপাসের এরূপ নামকরণ। শিকারে মারাত্মক পারদর্শী ভুতুড়ে প্রকৃতির এই প্রাণীরা শিকারকে সম্পূর্ণ গিলে খেতে পারে। তবে বিস্ময়কর ব্যাপার হল ট্রেঞ্চের এত গভীরের জমকালো অন্ধকারেও এরা নিজেদের শরীরে থেকে এক ধরনের আলো সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়াও প্রাগৈতিহাসিক যুগের, তিক্ষ্ণ ধারালো লম্বা দাঁতযুক্ত, হিংস্র ‘ফ্রিল্ড শার্ক’ যা বিজ্ঞানীদের কাছে "লিভিং-ফসিল" নামেও পরিচিত।
★ সার্কাস্টিক ফ্রিঞ্জহেডঃ- সত্যিই এরা সার্কাস্টিক! আকারে খুব বেশি বড় না হলেও ক্ষিপ্রতায় একেবারে ফার্স্ট এই প্রাণীদের আক্রমণের ধরন অভিনব এবং ভয়ঙ্কর! এদের আয়তন খুবই ক্ষুদ্রাকার, ১০-১২ ইঞ্চির মধ্যে। এরা কারো কোনো উপস্থিতি একবার টের পেলেই, অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সাথে বিশালাকার ‘হাঁ’- এর দ্বারা আক্রমণ করে বসে এবং এদের বিশাল হাঁ দিয়ে প্রতিপক্ষকে ধরাশায়ী করে ফেলে। ফ্রিঞ্জহেডদের মধ্যে যার হাঁ-এর আকৃতি সর্বাধিক, সে সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী।
★ডিপ-সি ড্রাগনফিসঃ- গভীর সমুদ্রের ভয়ঙ্কর শিকারি প্রাণীদের মধ্যে যে নামটি বারবার উঠে আসে তা হল ডিপ-সি ড্রাগনফিশ। এরা বায়োলুমিনিসেন্স পদ্ধতিতে নিজেদের শরীরে আলো তৈরি করতে পারে। এদের শরীর কঙ্কালহীন হয় এবং শরীরের তুলনায় দাঁতগুলি অতিমাত্রায় বড় হয়। এরা দেখতে হিংস্র হলেও দেহাকৃতি তুলনামূলকভাবে ছোট।
এছাড়াও অ্যাঙলার ফিস, টেলিস্কোপ অক্টোপাস প্রভৃতি উল্লেখ্য। কখনো কখনো হাইড্রোজেন সালফাইড সহ বিভিন্ন ধরনের খনিজ সমৃদ্ধ গরম জল বের হয় চ্যালেঞ্জার ডিপের ছিদ্রপথ দিয়ে। এগুলোই হল প্রধান ব্যারোফিলিক জাতীয় ব্যাকটেরিয়ার প্রধান খাদ্য। এসব ব্যাকটেরিয়া গুলোই আবার কিছু ছোট ছোট জীবের খাদ্য, যাদের দেখতে হলে শক্তিশালী অণুবীক্ষণ যন্ত্রের প্রয়োজন হয়। আবার, এদের খেয়ে বেঁচে থাকে মাছেরা। এভাবেই সাগরতলের এত গভীরেও জীবনের চক্র কিন্তু ঠিকই চলতে থাকে, যেমনটি চলে সাগরের ওপর। সাধারণত সমুদ্রতলের গভীরে মৃত প্রাণীর কঙ্কাল, খোলস জমা পড়তে থাকে। মারিয়ানা ট্রেঞ্চের তলও আলাদা নয়। তাই এখানকার জলের রং সে জন্যই কিছুটা হলুদ।
২০১০ সালে ডক্টর রবার্ট টার্নউইত্শের নেতৃত্বে স্কটিশ অ্যাসোসিয়েশন ফর মেরিন সাইন্সের তরফে চালকহীন একটি সাবমেরিন পাঠানো হয় মারিয়ানা খাতের গভীরে৷ সমুদ্রতলের উপর যে পলি থিতিয়ে পড়ে, তারই নমুনা সংগ্রহ করে আনা ছিল এই সাবমেরিন এর প্রধান উদ্দেশ্য৷ সেই পলিতে অক্সিজেনের উপস্থিতির পরীক্ষা করতে গিয়েই দেখা মেলে জীবাণুদের৷ প্রবল জলের চাপ, সূর্যালোকের অনুপস্থিতি এবং প্রবল ঠান্ডাতেও যারা বহাল তবিয়তে বেঁচে রয়েছে৷ এরা মূলত অ্যামিবা জাতীয় এককোষি প্রাণী৷ এবং আশ্চর্যজনক ব্যাপার হল, গভীরতার সঙ্গে সঙ্গে এদের সক্রিয়তা বাড়ে৷ মারিয়ানার অন্ধকূপেই তারা বেশি স্বচ্ছন্দ -- জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা৷ এখন প্রশ্ন হল -- ‘এদের খাদ্য কী’! খাদ্যতালিকাটা অবশ্য বেশ চমকপ্রদ৷ মরা গাছ পালা, প্রবাল, মৃত সামুদ্রিক প্রামীর দেহাবশেষ থেকে পলিমাটি -- সবই রয়েছে জীবাণুকুলের মেনুতে৷ স্কটিশ অ্যাসোসিয়েশন ফর মেরিন সায়েন্সের বৈজ্ঞানিকদের দাবি, মারিয়ানা খাতের দু’পাশের খাড়া দেওয়ালের খাঁজে খাঁজে আটকে থাকে এই জীবাণুরা এবং সেখানেই সমুদ্রের জল থেকে নিজেদের দেহে শুষে নেয় কার্বনজাত সামুদ্রিক বর্জ্য৷ ফলে ‘গ্লোবাল মেরিন কার্বন সাইকল’-এ এই জীবাণুদের উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন টার্নউইত্শ৷
১৯৮৫ সালে আমেরিকান জাহাজ গ্ল্যোমার চ্যালেঞ্জার ৯ মিটার সাইজের একটি কম্পিউটার ডিভাইস পাঠায় মারিয়ানা ট্রেঞ্চ এর গভীরে। ডিভাইসটি বেশ কয়েক মিটার গভীরে যাবার পরেই হঠাৎ করে অদ্ভুত রকমের শব্দ রেকর্ড করতে শুরু করে এবং একই সময়ে কোন এক নাম না-জানা অদ্ভুত শক্তি এই ডিভাইসের চেইন ধরে টানতে থাকে। ভয়ঙ্কর রকমের এই অজানা শক্তি জাহাজের সবাইকে ভীত করে দেয় ।প্রায় দু'ঘণ্টা পর অনুসন্ধানকারীরা তাদের ডিভাইসটি খুঁজে পায় এবং দ্রুত সেটিকে উপরে তুলে আনে। এরপর দেখা যায় ইস্পাতের তৈরি কেবিল এর অনেক অংশ থেঁতলে গেছে এবং প্ল্যাটফর্মের অনেক স্থানে কামড়ের চিহ্ন। কিন্তু বিজ্ঞানীদের মতে পৃথিবীতে এমন কোন প্রাণী নেই যার দাঁতের কামড়ে এতটা শক্তি থাকতে পারে। শুরু হয় লম্বা গবেষণা। এর ফলে যা জানা যায় তা হল, সমুদ্র দানব মেগালেডন সামুদ্রিক হাঙ্গর। কিন্তু এই দৈত্যাকার দানব পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে প্রায় ১৫ লক্ষ বছর আগে। এখন প্রশ্ন হল, এই গবেষণা রিপোর্ট যদি সত্যি হয় এর অর্থ এই দাঁড়ায় যে দৈত্যাকার এই হাঙ্গর এখনও বিলুপ্ত হয়নি বরং মারিয়ানা ট্রেঞ্চ এর ভিতরে গভীরে আশ্রয় নিয়েছে সে এবং লক্ষ লক্ষ বছর ধরে টিকিয়ে রেখেছে বংশধারা। বিজ্ঞানীরা মনে করতেন পৃথিবীর গভীরে শুধু মেগালেডন নেই রয়েছে আরও অনেক বিস্ময়কর ভয়াবহ সামুদ্রিক জীব, যাদের মুখোমুখি মানুষ আজও হয়নি।
গভীর সমুদ্রের গভীরতম অংশ মৃত্যুর মুক্তাঞ্চল নয়৷ সেখানেও রয়েছে প্রাণ৷ শুধু তাই নয়, সমুদ্র থেকে কার্বন শুষে নেওয়ায় সিদ্ধহস্ত এই সব জীবাণুরা পৃথিবীর স্বাস্থ্যরক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বলেই মনে করছেন বৈজ্ঞানিকরা৷ বলাবাহুল্য, সিংহভাগ সমুদ্র বিজ্ঞানীদের বিস্ময়ের একটি প্রধান কারণ হল, এইরকম চরম প্রতিকূল পরিবেশেও যুগের পর যুগ ধরে কিভাবে এ সমস্ত প্রাণীগুলি নিজেদের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রেখেছে তা সত্যিই অজানা। চলছে অজানাকে জানার, অচেনাকে চেনার খোঁজ।
চ্যালেঞ্জার ডিপের গভীরতা পরিমাপের ইতিহাসও বেশ বড় ; ডিসেম্বর ১৮৭২ – মে ১৮৭৬ এর মধ্যে সম্পন্ন এইচএমএস চ্যালেঞ্জার অভিযান সর্বপ্রথম আজকের চ্যালেঞ্জার ডিপ নামের অংশটির গভীরতা পরিমাপ করে। এই পরিমাপ সর্বপ্রথম হয় ১৮৭৫ সালের ২৩ মার্চ, এবং দুটি ভিন্ন পরিমাপে প্রাপ্ত গভীরতা দাঁড়ায় ৪,৪৭৫ ফ্যাদম (৮,১৮৪ মিটার বা ২৬,৮৫০ ফুট)।
১৯১২ সালে প্রকাশিত স্যার জন মারের লিখিত ডেপথ্স অফ দ্য ওশান নামের এক বইতে তিনি চ্যালেঞ্জার ডিপের গভীরতা ৩১,৬১৪ ফুট (৯,৬৩৬ মিটার) হিসেবে প্রকাশ করেন। এই স্যার জন মারে চ্যালেঞ্জার অভিযানের সময় একজন বিজ্ঞানী হিসেবে ঐ জাহাজে ছিলেন।
১৯৫১ সালে, মূল অভিযানের প্রায় ৭৫ বছর পর, সম্পূর্ণ মারিয়ানা খাত এলাকা ব্রিটিশ রয়াল নেভির জাহাজ দ্বারা পরিমাপকৃত হয়। এই জাহাজের নামও ছিল এইচএমএস চ্যালেঞ্জার, এবং এর ক্যাপ্টেন ছিলেন জর্জ স্টিফেন রিশি (পরবর্তীকালে রিয়ার অ্যাডমিরাল রিশি)। এই জরিপে শব্দের প্রতিধ্বনি কাজে লাগিয়ে চ্যালেঞ্জার ডিপের গভীরতা পরিমাপ করা হয়, এবং ফলাফল আসে ৫,৯৬০ ফ্যাদম (১০,৯০০ মিটার বা ৩৫,৭৬১ ফুট)। এই পরিমাপ যেখানে করা হয়, তার স্থানাঙ্ক হচ্ছে ১১°১৯′ উত্তর ১৪২°১৫′ পূর্ব। ১৯৮৪ সালে এক জাপানি বিজ্ঞানীদের চ্যালেঞ্জার অভিযানে চ্যালেঞ্জার ডিপের গভীরতা পাওয়া যায় ১০,৯২৪ মিটার (৩৫,৮৪০ ফুট)। ২০০৫ সালে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী চ্যালেঞ্জার ডিপের গভীরতা সবচেয়ে পরিমাপকৃত ফলাফল ১১,০৩৪ মিটার (৩৬,২০০ ফুট)। অর্থাৎ, সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচ থেকে এর গভীরতা প্রায় ৬.৭৪ মাইল। চ্যালেঞ্জার ডিপের গভীরতায় জলের চাপ সমুদ্রপৃষ্ঠের তুলনায় প্রায় ১,০৯৯ গুণ বেশি অর্থাৎ প্রায় ১১১ মেগা প্যাসকেল।
১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে প্রথম বার মারিয়ানা ট্রেঞ্চের গভীরতা মাপে ব্রিটিশ জাহাজ এইচ এম এস চ্যালেঞ্জার। পরে বহু বার বিশ্বের গভীরতম খাত নিয়ে গবেষণা হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তিত হয়েছে এর গভীরতা সংক্রান্ত তথ্য। আজ অবধি মাউন্ট এভারেস্টের শীর্ষবিন্দুতে অসংখ্য অভিযাত্রীর পা পড়েছে। কিন্তু নগণ্য সংখ্যক অভিযাত্রী বা সমুদ্রবিজ্ঞানীদের পা গিয়ে পৌঁছেছে এই রহস্যাবৃত মারিয়ানা ট্রেঞ্চে।
জাক পিকার্ড এবং মার্কিন নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট ডন ওয়ালশ এই দুই দুঃসাহসী ১৯৬০ সালে মার্কিন নৌসেনার ব্যাথিস্কেপে চেপে পৌঁছেছিলেন মারিয়ানা ট্রেঞ্চের গভীরে। ব্যাথিস্কেপ হল সমুদ্রের গভীরে অভিযান চালানোর জলযান। যদিও ডুবোজাহাজের সঙ্গে এর অনেকটাই বৈসাদৃশ্য আছে। সুইস ও ইতালীয় প্রযুক্তিতে নির্মিত ব্যাথিস্কেপ ‘ত্রিয়েস্ত’-এর সাহায্যে বিশ্বের গভীরতম বিন্দুতে অভিযান চালিয়েছিলেন এই অভিযাত্রী জুটি। ৫ ঘণ্টা ধরে অবতরণের পরে গন্তব্যে পৌছতে পেরেছিলেন পিকার্ড এবং ওয়ালশ। কিন্তু চ্যালেঞ্জার ডিপ-এর গভীর বিন্দুতে থাকতে পেরেছিলেন মাত্র ২০ মিনিট। এই জুটি চ্যালেঞ্জার ডিপের ১০,৯১৬ মিটার গভীরতা পর্যন্ত নামতে পেরেছিল। তাদের যাত্রাপথ ঘিরে ক্লাউড অফ সিল্ট অবস্থান করায়, তারা তাদের যাত্রাপথে বা গভীরতম বিন্দুতে পৌঁছে কোনও ছবি তুলতেই পারেননি। কিন্তু প্রশ্ন হল মহাসাগরের এত গভীরে মেঘ এল কোথা থেকে? আসলে এই মেঘ আকাশের জলীয় বাষ্পপূর্ণ কণার সমষ্টি নয়, এ হল বালি, কাদা, মাটি ও অন্যান্য উপকরণের সমষ্টি, যা জলের প্রবাহে ক্রমাগত জমতে থাকে মহাসগরের গভীর খাতে। সেই জমাটবদ্ধ বালি-কাদামাটির অংশকেই মেঘ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। কাদামাটির জমাট মেঘ এবং নিকষ কালো অন্ধকার ভেদ করে ‘ত্রিয়েস্ত’-এর আলো রহস্যভেদ করতে পারেনি। যদিও পিকার্ড বার বার দাবি করেন, তিনি গভীর খাতে একটি ফ্ল্যাটফিশ দেখেছিলেন। কিন্তু সেই মুহূর্তে তাঁর দাবির সঙ্গে অধিকাংশ বিজ্ঞানী সহমত হতে না পারলেও পরবর্তীকালে মারিয়ানা ট্রেঞ্চের গভীরে প্রাণের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
টাইটানিক ও অবতার ছবির পরিচালক কানাডার অধিবাসী জেমস্ ক্যামেরন ২০১২ সালে পৃথিবীর গভীরতম মারিয়ানা ট্রেঞ্চের ৩৫,৭৫৬ ফুট গভীর পর্যন্ত অবতরণ করে অনন্য নজির সৃষ্টি করেন। তার এই অভিযানটির জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছিল ১২ টন ওজনের একটি সাবমেরিনকে। দুঃসাহসিক অভিযান শেষে বিশ্বনন্দিত পরিচালক জেমস ক্যামেরন মন্তব্য করেন -- "মারিয়ানা খাত চাঁদের মতোই নির্জন"। কিন্তু সাম্প্রতিককালে, গভীর সমুদ্রখাতের গভীরতম বিন্দুতে ১০,৯২৭ মিটার অবধি নেমে, পুরানো রেকর্ড ভেঙে নতুন করে গড়ে তোলেন এক মার্কিন অভিযাত্রী ভিক্টর ভেসকোভো। তার মতে অজানা প্রাণ ও অদ্ভুত পরিবেশ আবিষ্কারের আনন্দই তাকে এই দুঃসাহসিক কাজে সাহস জোগায়। সমুদ্রের নিচে এখনো অনেক আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে পারে না মানুষ। তাই মারিয়ানা ট্রেঞ্চের সঠিক গভীরতাও আমাদের অজানা। তবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে জলের নিচের সব তথ্যও জানবে মানুষ, জয় করবে সমুদ্রের নিচের রাজ্যও। তখন নিশ্চয়ই অনেক দুঃসাহসী অভিযাত্রী মারিয়ানা ট্রেঞ্চে ছুটবেন পৃথিবীর গভীরতম স্থানে অবতরণ করার রোমাঞ্চকর অভিযানের হাতছানিতে।
গঙ্গা নয়, নয় হোয়াংহো, প্লাস্টিক এখন প্রশান্ত মহাসাগরের মারিয়ানা খাতের চ্যালেঞ্জার ডিপেও। সবচেয়ে লজ্জার ও দুঃখের বিষয় এই যে, আমরা মারিয়ানা খাতের গভীরে পৌঁছাতে না পারলেও আমাদের পরিত্যক্ত ও বর্জ্য পদার্থ ঠিকই পৌঁছে গেছে পৃথিবীর গভীরতম স্থানে। আমরা মারিয়ানাকে পুরোপুরি না জেনেও দূষিত করতে শুরু করেছি। যেখানে এতদিন মানুষ পৌঁছাতে পর্যন্ত পারেনি সেখানে স্তূপাকারে জমা রয়েছে রাশি রাশি প্লাস্টিক ও আবর্জনা। সাগরের জল বিষাক্ত হওয়ার খবরে আমরা যে খুব একটা বিচলিত নই তাতো মেনেই নিয়েছি। প্রায় প্রত্যেকটি দেশেই সরকারি ঢাকঢোল পিটিয়েও যে বাজার থেকে প্লাস্টিক সরানো যায় নি তা সত্য। ফলস্বরূপ, গঙ্গা, যমুনা, গোদাবরী, চিনের হোয়াংহো, মিশরের নীলনদ, জার্মানির রাইন বা অন্য কোন দেশের কোন নদী পথ দিয়ে প্লাস্টিকের সাগর যাত্রা আটকানো যায় নি। আর ভবিষ্যতেও যে যাবে না তা আমরা বুঝে গেছি। কিন্তু সম্প্রতি এক খবরে তামাম বিশ্বই আজ স্তম্ভিত। সেই আসল খবরেই নজর দেওয়া যাক -- প্রশান্ত মহাসাগরের মারিয়ানা খাতের গভীরতম বিন্দুকে অভিযাত্রীরা চেনেন চ্যালেঞ্জার ডিপ নামেই। আর সেই গভীরতম স্থানেই যদি বর্জ্য পদার্থের সঙ্গে প্লাস্টিকের দেখা মেলে অবাক তো হতেই হয়। আর সেই ঘটনাই ঘটেছে সম্প্রতি প্রশান্ত মহাসাগরেই। দেখা মিলেছে সেই মারণ প্লাস্টিকের। আর সেটি পাওয়া গেছে সমুদ্রের গভীরতম স্থানেই। এই মুহূর্তে রাষ্ট্রসংঘের পর্যবেক্ষণ জানাচ্ছে, সাত সাগরের তলদেশে জমা মোট জঞ্জালের পরিমান প্রায় ১০ কোটি টন। যা সামুদ্রিক দূষণের মাত্রাকে দিন দিন বাড়িয়ে দিচ্ছে। এতদিন আমাদের গঙ্গা আর চীনের হোয়াংহোর দিকেই বিশ্বের নজর ছিল। কিন্তু সম্প্রতি এই খবরে চমকে উঠেছে বিশ্ববাসী। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির দিকে এখন তো আর আঙুল তোলা যাবে না। সেই রাষ্ট্রসংঘের পর্যবেক্ষণ ধরেই আজ বলা যায় প্রায় সব কটি দেশের নদী পথ ধরেই অন্যান্য বর্জ্যের সঙ্গেই প্লাস্টিকও হাঁটা দিয়েছে গভীর সমুদ্রের তলদেশে। তাই এই দায়ভার এখন সমগ্র বিশ্বের।
সমুদ্রের গভীরে যে প্লাস্টিক আছে তার প্রমাণ আগেই মিলেছে। গভীর সমুদ্রে ঘুরে বেড়ানো তিমি জাতীয় প্রাণীর পেটেও মাইক্রো প্লাস্টিক মিলেছে। কিন্তু তখনও কেউ ভাবেননি সমস্যার শিকড় এতো গভীরে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে এতদিন ভিলেন বানানো হয়েছিল। আঙুল উঠেছিল সে দিকেই। প্রশান্ত মহাসাগরের গভীরতম স্থানে এই প্লাস্টিকের উপস্থিতি এখন নতূন করে ভাবাচ্ছে তামাম বিশ্বকেই। সম্প্রতি মারিয়ানা খাতের গভীরে খোঁজ মিলেছে শিল্পাঞ্চলে ব্যবহার করা হয়, এমন বেশ কিছু সিনথেটিক যৌগের। বিজ্ঞানীদের গবেষণার রিপোর্ট বলছে, প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে দীর্ঘ সময় ধরে প্রচুর পরিমাণে নিষিদ্ধ রাসায়নিক জমেছে। শুধু তাই-ই নয়, এই রাসায়নিক রীতিমত বিষিয়ে ফেলেছে প্রশান্ত মহাসাগরের একটা বড় অঞ্চল।
মারিয়ানা এবং কারমাডেক খাতে চালানো বিজ্ঞানীদের সমীক্ষার ফলাফল সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে ‘নেচার, ইকোলজি অ্যান্ড ইভলিউশন’ জার্নালে। নিউক্যাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক আল্যান জেমিসন জানিয়েছেন, “মারিয়ানা খাতের দূষণের মাত্রা রীতিমতো পাল্লা দিচ্ছে জাপানের সবচেয়ে দূষিত এলাকা সুরুগা বে অঞ্চলের সঙ্গে। জনবসতি না থাকলেই আমরা আশা করি, সেই অঞ্চল, মানুষের তৈরি করা দূষণের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকবে। কিন্তু এটি আর সত্য রইল না। মারিয়ানা খাত তার জ্বলন্ত প্রমাণ”।
আশ্চর্যের বিষয়, মারিয়ানা এবং কারমাডেক খাত কিন্তু পাশাপাশি নয়। দুই অঞ্চলের মধ্যে ব্যবধান প্রায় ৭০০০ কিলোমিটারের। এ থেকে বিজ্ঞানীরা অনুমান করছেন, গোটা প্রশান্ত মহাসাগর জুড়েই দূষণের মাত্রাটা কম বেশি একই। মারিয়ানা খাতের দূষণের মাত্রা এতটাই ভয়াবহ, ইতিমধ্যে সেখানকার সামুদ্রিক জৈববৈচিত্রে বেশ কিছু নেতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ করা গিয়েছে। দুটি খাতেই খোঁজ পাওয়া গিয়েছে "পারসিস্ট্যান্ট অরগানিক পলিউট্যান্ট" অথবা পিওপি যৌগের। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় বছর ৪০ আগে নিষিদ্ধ হয়েছে এই ধরনের যৌগের ব্যবহার।
সম্প্রতি অজানা প্রাণ আবিষ্কারের উদ্দেশ্যে মার্কিন অভিযাত্রী ভিক্টর ভেসকোভো পৃথিবীর গভীরতম স্থান মারিয়ানা ট্রেঞ্চের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। কিন্তু সেই আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে উঠে এসেছে পৃথিবীর গভীরতম সমুদ্রখাতে প্লাস্টিকের উপস্থিতি। ভেসকোভো যখন মনের আনন্দে আবিষ্কারের নেশায় তলদেশে নামেন তখনই চোখে পড়ে ভাঙা ধাতব খন্ড ও প্লাস্টিকের টুকরো। যা বিষন্ন করে ভেসকোভোকে। অবাক হন তিনি সমুদ্রের গভীরে বসেই। এক বারের চেষ্টায় ভেসকোভো এই চ্যালেঞ্জার ডিপে পৌঁছাতে সক্ষম হননি।একুশ দিন সাবমেরিনে চেপে তিনি চারবার জলের গভীরতম স্থানে যাবার চেষ্টা করেন। চারবারের চেষ্টাতে তিনি সফল হন। সমুদ্রের প্রায় ১০৯২৮ মিটার গভীরে নেমে পড়েন। নৌ বাহিনীর প্রাক্তন অফিসার ভেসকোভোর দাবি যেখানে এখনও মানুষের পদচিহ্ন পড়েনি সেই স্থানে তিনি পৌঁছে গিয়েও তিনি হতাশ হয়েছেন প্লাস্টিকের দেখা মেলায়। চারবারের এই অভিযানে একবার তিনি জলের তলদেশে কাটান কমপক্ষে চার ঘন্টা। সে বার লম্বা লম্বা পায়ের চিংড়ির দেখা মেলে। নানা অদ্ভুত প্রাণীও চোখে পড়ে। প্রায় স্বচ্ছ দেখতে সমুদ্র শসা জাতীয় প্রাণীকে খেলা করতে দেখেন গভীর জলে। এগুলি গভীর সমুদ্রে খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু এই গভীরতম স্থানে বজ্য পদার্থের সঙ্গে প্লাস্টিকের টুকরো এবং ধাতব খন্ডের অবস্থান তাঁর কল্পনার অতীত। আর সত্যি হল সেই প্লাস্টিক এসেছে উন্নয়নের শিখরে থাকা দেশগুলির নদী পথ ধরেই।
সাম্প্রতিক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দাবি করেছেন, মারিয়ানার গভীরে প্রাপ্ত দূষক কোন সাধারন জৈব দূষক নয়, তা ক্যান্সার সৃষ্টিকারী ভারী ধাতু 'পারদ'। গবেষণায় দেখা গেছে সমুদ্রের নিচে ১০০ থেকে ২০০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত এই পারদ লক্ষ্য করা যায়। তার নিচে এই ধাতুর তেমন কোনো অস্তিত্ব নেই। অনেকে মনে করেন, ভারী বৃষ্টিপাত বা তেমন কোন প্রাকৃতিক কারণে এই গভীরতা পৌঁছে গিয়েছে পারদ। কিন্তু তাহলেও মানুষের দায়িত্ব অস্বীকার করা যায় না।
নানাভাবে প্রকৃতিকে বিপন্ন করে আজ মানুষ তার নিজের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলেছে। অতএব, মানুষকে বাঁচতে গেলে বাঁচাতে হবে প্রকৃতিকেও। নদীগুলি ও সমুদ্র যে ময়লা ফেলার ডাস্টবিন নয় তা মানুষ বুঝবে কবে? আশা করা যায়, মারিয়ানা খাতের প্লাস্টিক বর্জ্যের উপস্থিতি আমাদের সচেতনতা বাড়বে। মহাসমুদ্র গুলি যে ময়লা ফেলার জায়গা নয় তা বুঝতে হবে। সমুদ্রকে বাঁচাতে হলে আরো কড়া নীতি নিতে হবে। ২০০৯ সালে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র মারিয়ানা ট্রেঞ্চকে 'ন্যাশনাল মনুমেন্ট' হিসেবে ঘোষণা করে। তবে 'চ্যালেঞ্জার্স ডিপে প্লাস্টিক' -- এটা স্বপ্ন নয় সত্যি! গল্প তো নয়ই। নির্ভেজাল এক চরম সত্যর মুখোমুখি আর অন্য কোন প্রাণী নয়, আমরা মানুষরাই।
****************************************
লেখকঃ- টুবাই ঘোষ (ঘোড়াডাঙ্গা, পূর্ব বর্ধমান)
[লেখক মুর্শিদাবাদের পাটিকাবাড়ি হাই স্কুলের ভূগোল শিক্ষক]
তথ্যসূত্রঃ- উইকিপিডিয়া ; আনন্দবাজার পত্রিকা ; এইসময় পত্রিকা ; বিবিসি নিউজ ; হিস্ট্রি টিভি ; ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ; এনসাইক্লোপিডিয়া অফ ব্রিটানিকা