24/11/2016
স্বাধীনতা সংগ্রামী
দেশপ্রাণ বীরেন্দ্রনাথ শাসমল (জন্মঃ- ২৬ অক্টোবর, ১৮৮১ - মৃত্যুঃ- ২৪ নভেম্বর, ১৯৩৪)(সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান অনুযায়ী)
তিনি পেশায় ছিলেন আইনজীবী। তিনি রাজনীতিকে সমাজকল্যাণের সমার্থক মনে করতেন। তাই তিনি ১৯১৩, ১৯২০, ১৯২৬ ও ১৯৩৩ সালে মেদিনীপুরের বন্যায় ত্রাণ কর্মী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সর্ব ভারতীয় কংগ্রেস কমিটির ১৯২০ সালের কলকাতা সম্মেলনে তিনি একটি প্রধান ভূমিকা পালন করেন এবং ১৯২১ সালের অহিংস অসহযোগ আন্দোলন সম্পর্কিত প্রস্তাব সমর্থন করেন। তবে শাসমল ইতোমধ্যেই চিত্তরঞ্জন দাশের স্বরাজ্য পার্টিতে যোগ দিয়েছিলেন। নাগপুর সম্মেলন থেকে ফিরে এসে শাসমল তাঁর লাভজনক আইন ব্যবসা ছেড়ে অসহযোগ আন্দোলনে (১৯২১) যোগ দেন। তিনি বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত হন। এসময়েই তিনি তাঁর নিজ জেলাতে ইউনিয়ন বোর্ড বিরোধী বিক্ষোভ গড়ে তুলতে সক্ষম হন।
শাসমল জাতীয় শিক্ষার সমর্থক ছিলেন। তিনি মনে করতেন শিক্ষা হওয়া উচিত অবৈতনিক এবং ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সকলেরই শিক্ষার সুযোগ থাকা উচিত। তিনি কোন্তাইয়ে নিজ বাসগৃহে একটি জাতীয় স্কুল স্থাপন করেন।
১৯২৪ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রিন্স অব ওয়েলস-এর ভারত সফর বয়কটকে কেন্দ্র করে বাংলার নগরগুলিতে অসন্তোষ চরমে পৌঁছে। ১০ ডিসেম্বর চিত্তরঞ্জন দাশ, আবুল কালাম আজাদ, সুভাষচন্দ্র বসু ও অন্যান্য আরও কয়েকজনের সাথে শাসমলকে বয়কট সংঘটিত করার দায়ে গ্রেফতার করে ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদন্ড প্রদান করা হয়।
জেল থেকে মুক্তি পেয়ে শাসমল বঙ্গীয় প্রাদেশিক স্বরাজ্য পার্টি গঠনে চিত্তরঞ্জন দাশকে সহায়তা করেন এবং এর সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত হন। আইন পরিষদে তিনি পার্টির হুইপ নির্বাচিত হন। তিনি কলকাতা করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী হতে ইচ্ছুক ছিলেন। কিন্তু পাছে কলকাতার কায়স্থগণ রুষ্ট হয় এ ভয়ে চিত্তরঞ্জন দাশ শাসমলকে এ পদে মনোনীত করতে ভয় পান। চিত্তরঞ্জন দাশের সমর্থনপুষ্ট হয়ে সুভাষচন্দ্র বসু প্রধান নির্বাহী হন। অপমানিত শাসমল এ ঘটনায় ক্ষুব্দ হয়ে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটি ত্যাগ করে তাঁর আইন ব্যবসায় প্রত্যাবর্তন করেন এবং মেদিনীপুরের আঞ্চলিক রাজনীতিতে তাঁর নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু পুনরায় তিনি বঙ্গীয় আইন পরিষদে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন।
শাসমল ১৯২৮ সালের বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির কৃষ্ণনগর অধিবেশনে সভাপতি নির্বাচিত হন। কিন্তু সভাপতির ভাষণে সন্ত্রাস ও সহিংসতার ওপর তাঁর মন্তব্যের কারণে তাঁর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব পাস হয়। বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির সভাপতির পদ থেকে শাসমলকে বাদ দেওয়ায় বেঙ্গল প্যাক্ট ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। মুসলমান বিরোধী একটি অংশ বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটিতে প্রাধান্য বিস্তার করে এবং এর প্রতিবাদে শাসমল, তাঁর বন্ধুমহল ও পার্টির মুসলমান সদস্যগণ দল ত্যাগ করেন। প্রবীণ জাতীয়তাবাদী মুসলমান নেতাগণ কংগ্রেস ত্যাগ করে সাম্প্রদায়িক দল থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
১৯৩০ সালের আইন অমান্য আন্দোলনের সময় মেদিনীপুর জেলা প্রশাসনের বর্বরতা তদন্ত করার জন্য নিয়োজিত বেসরকারি কমিটির সদস্য থাকাকালে তিনি স্বেচ্ছায় কারাবরণ করেন। মুক্তি পাওয়া মাত্রই তিনি চট্টগ্রাম আসেন অস্ত্রাগার লুণ্ঠন মামলায় (১৯৩০) আসামী পক্ষের উকিল হয়ে বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করার জন্য এ মামলায় তাঁর যোগদান সহযোদ্ধাদের প্রতি তাঁর গভীর মমত্ববোধের পরিচায়ক। ১৯৩২ সালের ডগলাস হত্যা প্রচেষ্টা মামলায় আবারও আসামী পক্ষের উকিল হিসেবে তিনি কাজ করেন। রামসে ম্যাকডোনাল্ডের সাম্প্রদায়িক রোয়েদাদের প্রতিবাদ জ্ঞাপনের জন্য জাতীয়তাবাদী কংগ্রেস দল আহুত কলকাতা অধিবেশনে তিনি যোগ দেন। ১৯৩৪ সালের ২৪ নভেম্বর তাঁর মৃত্যু হয়।
জন্ম
১৮৮১ সালে মেদিনীপুরের কোন্তাই মহকুমাধীন চাঁদীভেটিতে জন্মগ্রহণ করেন। বীরেন্দ্রনাথ শাসমল তাঁর দেশপ্রেমের জন্য ‘দেশপ্রাণ’ নামে খ্যাত ছিলেন। গভীরভাবে ব্রাহ্ম ধর্ম প্রভাবিত এক পরিবারে তাঁর জন্ম।
১৯০০ সালে বীরেন্দ্র শাসমল কোন্তাই হাই স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি তাঁর শিক্ষক তারকগোপাল ঘোষ ও শশীভূষণ চক্রবর্তী কর্তৃক বিশেষভাবে প্রভাবিত ছিলেন। প্রথমে কলকাতা মেট্রোপলিটন কলেজে ভর্তি হলেও সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জীর কাছে শিক্ষা গ্রহণের মানসে পরে রিপন কলেজে যোগ দেন। এরপর তিনি আইন শাস্ত্র অধ্যয়নের জন্য ইংল্যান্ডের মিডল টেম্পলে যান এবং এ সময়েই তিনি আমেরিকা ও জাপানে সংক্ষিপ্ত ভ্রমণ করেন।
১৯০৪ সালে তিনি ব্যারিস্টার হিসেবে কলকাতা হাই কোর্টে যোগ দেন এবং কয়েক বছর আইন ব্যবসার সাথে যুক্ত থাকেন। এরপর তিনি মেদিনীপুর জেলা আদালতে চলে আসেন। ছাত্র থাকাকালীন অবস্থায়ও তিনি স্বদেশী আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন। ইংল্যান্ড থেকে ফেরার পর তিনি জেলা বোর্ড ও মিউনিসিপ্যালিটির সদস্য হন। ১৯১৩ সালে পুনরায় কলকাতা প্রত্যাবর্তন করে তিনি হাই কোর্টে আইন ব্যবসা শুরু করেন।